ঢাকা বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

চুয়াডাঙ্গার পরিত্যক্ত জেলখানার নীরব আর্তনাদ

চুয়াডাঙ্গার পরিত্যক্ত জেলখানার নীরব আর্তনাদ

চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃশব্দ ইতিহাস—পুরোনো উপ-জেল কারাগার ভবন। এক সময় যেখানে লোহার ফটকের শব্দে কেঁপে উঠত বাতাস, যেখানে বন্দিদের পায়ের শব্দ আর কারারক্ষীদের হুকুম ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী, আজ সেখানে ঝোপঝাড় আর নীরবতা। স্থানীয়দের মুখে মুখে জায়গাটির নতুন নাম ‘ভূতের বাড়ি’।

১৯১৩ সালের দিকে এটি কুষ্টিয়া মহকুমার উপ-কারাগার ছিল। নির্মিত এই মিনি উপ-জেলটির ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ১০০ জন বন্দি। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে উপ-জেলটি জেলা কারাগার হিসেবে উন্নীত হয়।

জেলা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে ৯.৫০ একর জমির ওপর ভিমরুল্লায় তৈরি হয় নতুন ও আধুনিক জেলা কারাগার, যার বন্দি ধারণক্ষমতা ৩০০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৬৪ জন ও মহিলা ৩৬ জন।

২০০৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পুরাতন কারাগার থেকে বন্দিসহ সবকিছু সরিয়ে নেওয়া হয় নতুন কারাগারে। স্থানান্তরের পর দেশের অন্যান্য উপ-কারাগারের মতো এটিও অচল হয়ে পড়ে। তারপর কেটে গেছে ১৯ বছর ও তার বেশি সময়। তদারকির অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি আর সময়ের নির্মমতায় দরজা-জানালাগুলো ভেঙে গেছে, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে, দেয়ালে জন্মেছে শ্যাওলা।

এক সময় এই জেলখানার ভেতরে ছিল আলাদা আলাদা ওয়ার্ড—আমদানি সেল, মেঘনা, হাসনাহেনা, চম্পাকলি, নীলনদ, পদ্মা, সুরমা ও রূপসা। নামগুলোর মধ্যেই যেন ছিল এক অদ্ভুত সৌন্দর্য। দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা ওইসব ভবনে বসে কাজ করতেন। ডান দিকে ‘আমদানি ওয়ার্ড’ বলে পরিচিত ‘যমুনা সেল’। টিনের ছাউনির একতলা লম্বা ঘর। দরজা বলতে লোহার ফটক। তা দিয়ে যতটুকু আলো-বাতাস আসে, ফলে দিনেও ভেতরটা আবছা আঁধার।

কারাগারে আসা বন্দিদের প্রথমে এখানে রাখা হতো। পাশেই তিনতলা ‘মেঘনা’ ভবন, সাধারণ বন্দিদের ওয়ার্ড। হাসপাতাল ওয়ার্ড ছিল তুলনামূলক আরামদায়ক—এমনটাই জানালেন প্রবীণ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।

দিনের বেলায়ও ভবনটিতে প্রবেশ করলে এক ধরনের ভৌতিক অনুভূতি কাজ করে। ভাঙা সিঁড়ি, মরিচা ধরা প্রাচীর, ফাঁকা কক্ষ—সব মিলিয়ে যেন এক থমথমে পরিবেশ।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এই জেলখানাটা এক সময় ছিল আমাদের এলাকার পরিচয়। এখন দেখলে কষ্ট লাগে। ছেলেমেয়েরা ভয় পায় পাশ দিয়ে হাঁটতে। আমরা চাই সরকার এটা সংস্কার করে ভালো কিছুর জন্য ব্যবহার করুক।

আরেক বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, জায়গা পড়ে আছে, এখানে যদি পার্ক বা কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হতো, আমাদের সন্তানদের উপকার হতো।

আরেক বাসিন্দা আব্দুল্লাহ হক বলেন, আমরা চাই এখানে একটি ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী গড়ে উঠুক, যেখানে নতুন প্রজন্ম আমাদের অতীত সম্পর্কে জানতে পারবে। পাশাপাশি থাকবে বিনোদন ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ।

এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কর্মকর্তা মহসীন রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পরিত্যক্ত পুরাতন কারাগারের জায়গাটি গণপূর্ত বিভাগের অধীনে রয়েছে এবং জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কারাগারের স্থানে জজ আদালত ভবন নির্মাণ করা হবে বলে জানান তিনি।

নীরব আর্তনাদ,চুয়াডাঙ্গা,পরিত্যক্ত জেলখানা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত