
সীমান্তে ঘাস কাটতে গিয়ে বিএসএফের হাতে আটক হয়েছিলেন দিনমজুর আজিজুর রহমান (৪৫)। দীর্ঘ ১১ মাস ভারতের কারাগার ও হাসপাতালে কাটানোর পর অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেছেন তিনি। কিন্তু মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নিজ দেশে ফেরেনি তার নিথর দেহ। স্বামীর লাশ পাওয়ার আশায় এখন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন সহায়-সম্বলহীন বিধবা স্ত্রী তাছকারা বেগম।
টাকার অভাবে লাশ আনতে না পারার অসহায়ত্ব আর প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখার আকুতিতে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার শাহানাবাদ গ্রামের আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে।
বিজিবি ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২৫ সালের ১৩ মে দুপুরে রানীশংকৈল উপজেলার শাহানাবাদ গ্রামের চারজন প্রতিবেশী সীমান্তে ঘাস কাটতে যান। সীমান্ত পিলার ৩৭৩/১-এস-এর কাছাকাছি পৌঁছালে ভারতের ১৮৪ আমবাড়ী ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা তাদের ধাওয়া করে। তিনজন পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও বিএসএফের হাতে ধরা পড়েন দিনমজুর আজিজুর।
আজিজুরের স্ত্রী তাছকারা বেগমের অভিযোগ, তার স্বামীকে অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে গিয়ে বিএসএফ সদস্যরা পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের ফলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ ১১ মাস ভারতে বন্দি অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২২ মার্চ ২০২৬, ভারতের ইসলামপুরের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ভারতে থাকা আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে এই হৃদয়বিদারক খবর পায় পরিবারটি।
নিহত আজিজুরের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, আর একমাত্র ছেলেটি মানসিক প্রতিবন্ধী। ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই এই পরিবারের। স্বামীকে হারিয়ে তাছকারা বেগম এখন দিশেহারা। এর মধ্যে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে লাশ আনার খরচ।
তাছকারা বেগমের দাবি, সোমবার হরিপুর থানা ডিএসবি ইনচার্জ আল ইমরান তাকে জানিয়েছেন, ভারত থেকে লাশ আনতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হতে পারে। এ কথা শুনে আকাশ ভেঙে পড়েছে নিঃস্ব পরিবারটির ওপর।
তবে ডিএসবি ইনচার্জ আল ইমরান বলেন, “ভারত সরকার জানতে চেয়েছে পরিবার নিজ খরচে লাশ নেবে কিনা। আমি শুধু সেই তথ্যটিই তাদের দিয়েছি।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাছকারা বেগম বলেন, “আমার স্বামী তো নিজ দেশে মারা যায়নি। জীবনের শেষযাত্রায় ওনাকে একবার ছুঁয়ে দেখতে পারলে মনটা শান্তি পেতো। নিজ দেশে দাফন করতে পারলে স্ত্রী হিসেবে ধন্য হতাম। আমার স্বামীকে বিএসএফ পিটিয়ে মেরেছে, আমি এর বিচার চাই।”
পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে হাত পেতে এখন দিন কাটছে তার। স্বামী হারানোর শোক আর লাশ না পাওয়ার যন্ত্রণা তাকে বারবার মূর্ছা দিচ্ছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজির আহমেদ জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং লাশ ফেরত আনার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সীমান্তের এই নিষ্ঠুরতা আর আইনি মারপ্যাঁচে আটকে থাকা একটি লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পরিবারটি। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত তাছকারা বেগমের একটাই আকুতি—রাষ্ট্র যেন তার স্বামীর লাশটি অন্তত বিনামূল্যে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে।