ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রেলওয়েতে একই বিল দুইবার উত্তোলন, দুই কর্মচারীর ‘গুরুদণ্ড’

রেলওয়েতে একই বিল দুইবার উত্তোলন, দুই কর্মচারীর ‘গুরুদণ্ড’

পরস্পরের যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজের একই বিল দুইবার উত্তোলন পূর্বক সরকারি অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত থাকার গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের দুই কর্মচারীকে চাকুরিবিধি অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করেছে কর্তৃপক্ষ।

দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মচারীরা হলেন, তারিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিন। তারা দুজনেই লালমনিরহাটের রেলওয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলী দপ্তরের অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক। শাস্তি কার্যকর হওয়ার পর বর্তমানে তাঁদের রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে বদলি করা হয়েছে।

অপরাধ গুরুতর হওয়ায় ‘গুরুদণ্ড’ হিসেবে তাদের দুজনকেই আগামী পাঁচ বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিতকরণ করা হয়।

রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লালমনিরহাট স্টেশন থেকে আদিতমারী পর্যন্ত রেললাইনের প্রোটেকশন ওয়ালের কাজ পায় ‘মেসার্স রিচ ডেভলপমেন্ট এন্ড হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ওই কাজের চূড়ান্ত বিল গত ২৪ সালের ১০ জানুয়ারি অর্থনৈতিক কোড নং-৩২৫৮২০৬ হতে ১৭,৮৯,৭৫৫.২৭৮/= (সতের লক্ষ ঊননব্বই হাজার সাতশত পঞ্চান্ন দশমিক দুই সাত আট) টাকা পরিশোধ করা হয়।

একই বিল ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ভিন্ন অর্থনৈতিক কোড নং-৪১১১৫০১ হতে পুনরায় একই পরিমাণ টাকা পরিশোধ করা হয়, যা মারাত্মক অনিয়ম এবং আর্থিক দুর্নীতি। লালমনিরহাটের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন) মোঃ শিপন আলী এ অনিয়মের বিষয়টি উদঘাটন পূর্বক গতবছরের ১ ডিসেম্বর তাদেরকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা দায়ের করেন।

সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন)-কে আহবায়ক এবং এএমই (লোকো), এএসটিই ও এডিএও-কে সদস্য করে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্তে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তার প্রতিনিধি দ্বিতীয়বার বিল উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং তরিকুল ইসলাম এবং রইছ উদ্দিনের পরামর্শে প্রলুব্ধ হয়ে উক্ত টাকা আত্মসাত করেছেন বলে জবানবন্দি দেন। যদিও জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ার পরে সরকারি চালানের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার উত্তোলনকৃত টাকা জমা দেওয়া হয়।

এছাড়া ওই দুই কর্মচারীও 'কর্তব্যে অবহেলা' এবং 'ভুল হয়েছে' মর্মে লিখিত জবানবন্দি দেন। তবে তারা অন্যান্য দায় অস্বীকার করেন।

তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, তারিকুল ইসলাম তাঁর জবানবন্দীতে ওই কাজের বিল অর্থনৈতিক কোড ৩২৫৮২০৬ থেকে গত ১০/০১/২৪ তারিখে পরিশোধ করা হয় যার পিপি নোট তিনি প্রস্তুত করেছেন এবং ফাইলটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেছেন বলে স্বীকার করলেও তিনি পুনরায় উক্ত বিলটি প্রদানের সময় দায়িত্বে ছিলেন না মর্মে দায় অস্বীকার করেন।

কিন্তু তদন্ত কমিটি দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, পরবর্তী ২১-১০-২৫ তারিখে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থনৈতিক কোড নং-৪১১১৫০১ হতে পুনরায় টাকা পরিশোধের জন্য হিসাব বিভাগে প্রেরণকৃত বিলেও তারিকুল ইসলামের স্বাক্ষর আছে অর্থাৎ তিনি পরিকল্পিতভাবে একই কাজের প্রাক্কলন ভিন্ন দুটি অর্থনৈতিক কোডে দুইবার ভেটিং করে নেন এবং দুই অর্থনৈতিক কোডে বিল পরিশোধের দুইটি ফাইল প্রসেস করে রাখেন।

বর্ণিত কাজের ভুল অর্থনৈতিক কোড ৩২৫৮২০৬ থেকে প্রথমবার বিলটি পাশের পর তারিকুল ইসলাম দাপ্তরিক নথি গায়েব করে দেন এবং সঠিক অর্থনৈতিক কোড-৪১১১৫০১ অনুযায়ী বিলটি প্রসেস করে ভবিষ্যতে জালিয়াতি করার উদ্দেশ্যে উক্ত বিলটি দপ্তরে রেখে দেন।

ভবিষ্যতে জালিয়াতির লক্ষ্যে ১০/০১/২৪ তারিখে পেমেন্টকৃত বিলের বর্ণিত কাজটি ছয় মাস পর অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৈরীকৃত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এপিপিতে ক্যারি ফরওয়ার্ড হিসেবে রাখেন এবং কৌশলগতভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছর বিল পাশের চেষ্টা না করে বিরতি দিয়ে পুনরায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপিপিতেও ক্যারি ফরওয়ার্ড হিসেবে রাখেন এবং ২১/১০/২৫ তারিখে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পুনরায় বিলটি মো. শরিফুল হক শাকিলকে ঠিকাদার প্রতিনিধি সাজিয়ে পাশ করিয়ে নেন।

তবে মো. শরিফুল হক শাকিল তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, তারিকুল ইসলাম এবং রইছ উদ্দিন মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে পূর্বে ব্ল্যাঙ্ক চেকের পাতা নিয়ে রেখেছিলেন, সেই চেক ব্যবহার করে তিনি ঠিকাদারের একাউন্ট থেকে টাকা তুলে তাদের দেন।

আবার রইছ উদ্দিন তাঁর জবানবন্দীতে দায় অস্বীকার করলেও তিনিই মূলত ডিইএন লালমনিরহাট দপ্তরের হিসাব শাখার বিলের পিপি প্রস্তুত করা, অগ্রায়ন পত্র লেখা, এপিপি তৈরি, বিল রেজিস্টার তথ্য এন্ট্রি এবং নথিপত্র সংরক্ষণ করতেন। অর্থনৈতিক কোড নং-৪১১১৫০১ হতে পুনরায় ২১/১০/২৫ তারিখে উক্ত টাকা পরিশোধ করার বিল রেজিস্টার তাঁর হাতে লেখা। পূর্বের রেজিস্টার যাচাই-বাছাই করা ব্যতীত বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন) কাছ থেকে বিল পরিশোধের অগ্রায়ন পত্র হিসাব বিভাগে প্রেরণ, হিসাব বিভাগে গিয়ে প্রত্যয়ন সংগ্রহ করে আনা এবং প্রত্যয়ন পত্রের লেখাটি তিনি নিজ হাতে লিখে হিসাবরক্ষকের স্বাক্ষর নেওয়া ইত্যাদি কাজে মুখ্য ভূমিকা রাখেন।

এদিকে রেলওয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের সাথে কথা জানা গেছে, রইছ উদ্দিন রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে নিজে ঠিকাদারি কাজ করতেন। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর আপন ভাই মো. রাশেদুজ্জামান-এর নামে 'এ.আর এন্টারপ্রাইজ' নামক ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করতেন এবং এই লাইসেন্সের মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে ৮ থেকে ১০টি টেন্ডারের কাজ পেয়েছেন। বিভিন্ন নথিপত্র থেকে বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তবে তিনি কাজ নিজে না করে তিস্তা বাজার এলাকার রাসেলকে দিয়ে কাজ করিয়েছেন। এই রাসেল বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে আওয়ামীলীগের ঠিকাদার হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে কাজ করেছেন। আবার বর্তমানে বিএনপির ঠিকাদার সেজে কাজ করছেন। এছাড়া রইছ উদ্দিন লালমনিরহাটের ছাত্রলীগ নেতা মোহন এবং কাউনিয়ার জাতীয় পার্টির নেতা বেলাল-মোশারফকে দিয়েও কাজ করেছেন বলে একাধিক ঠিকাদারের দাবি।

এদিকে গঠিত তদন্ত কমিটি, সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি এবং দাপ্তরিক নথিপত্র সমূহ সার্বিক পর্যালোচনা করে দেখতে পান— একই কাজের একাধিকবার বিল পাশ ও পেমেন্টের ক্ষেত্রে প্রধান পরিকল্পনাকারী এবং অর্থ আত্মসাৎকারী তারিকুল ইসলাম এবং রইছ উদ্দিন।

তাদের উভয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি “রেলওয়ে কর্মচারী (দক্ষতা ও শৃঙ্খলা) বিধি, ১৯৬১” এবং সরকারের প্রচলিত অন্যান্য বিধিবিধান মোতাবেক ‘গুরুদণ্ড’ প্রদানের সুপারিশ করে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তাঁদেরকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিতকরণ করা হয়।

এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির প্রধান সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা প্রায় আটজনের সাক্ষ্য এবং জবানবন্দি গ্রহণ করেছি। সকল তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করার পর সন্দেহাতীতভাবে মনে হয়েছে তরিকুল ইসলাম এবং রইছ উদ্দিন অর্থ আত্মসাতের সাথে সরাসরি জড়িত। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ধারায় শাস্তির সুপারিশ করেছি।

রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় প্রকৌশলী শিপন আলী বলেন, এ ধরনের জাল-জালিয়াতির ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে তাই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শক্রমে তাঁদের বিরুদ্ধে এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়েছে।

দুই কর্মচারীর ‘গুরুদণ্ড’,দুইবার উত্তোলন,রেলওয়েতে বিল
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত