
টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নওগাঁর মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলার ফেরিওয়ালাদের নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে একসঙ্গে ছয়জনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গ্রামের কবরস্থানে পাশাপাশি তাদের দাফন করা হয়।
এর আগে সোমবার রাত ১২টার দিকে লাশবাহী গাড়িতে করে মরদেহ নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছানো হয়। রাতে পাকুড়িয়া গ্রামে দুই ভাই মাইনুল ইসলাম ও গিয়াস উদ্দিনের দাফন সম্পন্ন হয়। বাকিদের নিজ নিজ গ্রামে জানাজা শেষে দাফন করা হয়।
উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত জানাজায় উপস্থিত ছিলেন রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম. বজলুর রশিদ, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাজাহান, নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু, নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আখতার জাহান সাথী, মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
জানাজায় আশপাশের গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
স্বজনদের শেষ বিদায়ে কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারি ও বুকফাটা কান্নায় পুরো এলাকা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। স্থানীয়রা নিহতদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। নিহতদের একনজর দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন অনেকে।
পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নোয়াখালী থেকে একটি রডবাহী ট্রাকে করে নওগাঁর ২৬ যুবক বাড়ি ফিরছিলেন। পথে টাঙ্গাইলের কালিহাতি এলাকায় ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে মান্দার রাজেন্দ্রবাটি ও পাকুড়িয়া এবং নিয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চি ও রামগাঁও গ্রামের ১১ জন নিহত হন। এর মধ্যে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামেরই ছয়জন যুবক ছিলেন।
নিহতরা হলেন— রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে আব্দুল বারিক (২২), তার চাচা আব্দুর রহিমের ছেলে বাদশা (৪০), সাকিম হোসেনের ছেলে সাগর হোসেন (২২), আকবর আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (২০), সুলতান মাহমুদের ছেলে তারেক রহমান (১৮), শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল আলম (২৮), পাকুড়িয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে মাইনুল ইসলাম (২৮) ও তার ভাই গিয়াস উদ্দিন (২২), হোসেনপুর গ্রামের জাফের আলীর ছেলে মাইনুল ইসলাম (৩৫), নিয়ামতপুর উপজেলার রামগাঁও গ্রামের রহমতুল্লাহর ছেলে সুজন রেজা এবং মালঞ্চি গ্রামের সাইদুলের ছেলে সারিকুল (২৫)।
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে মরদেহ দাফনের জন্য আশপাশের গ্রাম থেকে পাঁচটি খাটিয়া আনা হয়। শরিয়ত অনুযায়ী সারিবদ্ধভাবে রাখা খাটিয়াগুলোতে মরদেহ একনজর দেখতে ভিড় করেন আশপাশের মানুষ।
রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম. বজলুর রশিদ বলেন, “নিহত পরিবারগুলোকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রতি পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। এ ঘটনায় আমরা সবাই শোকাহত। এক গ্রাম থেকে ছয়জন মানুষের একসঙ্গে চলে যাওয়া আমাদের মর্মাহত করেছে। পরিবারগুলোকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।”
স্থানীয় ও নিহতদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি, পাকুড়িয়া ও হোসেনপুর দরিদ্রপ্রবণ গ্রাম। এসব গ্রামের মানুষ জীবিকার তাগিদে নোয়াখালী ও ফেনী জেলার বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে হরেক রকম পণ্যের ব্যবসা করেন। এসব গ্রাম থেকে শতাধিক মানুষ ওই জেলাগুলোতে গিয়ে কেউ ১৫ দিন, কেউ ২০ দিন, কেউ ২৫ দিন বা এক মাস ব্যবসা করতেন। পরে কিছু আয় করে গ্রামে ফিরতেন। কিছুদিন অবস্থান করে আবার ব্যবসার উদ্দেশ্যে চলে যেতেন।
সবশেষ ২০ থেকে ২৫ দিন আগে তারা নোয়াখালী গিয়েছিলেন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে কিছু টাকা সাশ্রয়ের জন্য একটি ট্রাকে করে ২৬ জন একসঙ্গে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে সোমবার ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে রডবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।