ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দর্শনা সীমান্তে স্বর্ণ চোরাচালানের গডফাদার সামাদ, এখনও অধরা

দর্শনা সীমান্তে স্বর্ণ চোরাচালানের গডফাদার সামাদ, এখনও অধরা

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তবর্তী কামারপাড়া এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই স্বর্ণ ও হুন্ডি পাচারের অন্যতম হটস্পট হিসেবে পরিচিত। সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ পাচার থামেনি—বরং নীরবে আরও সুসংগঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এই সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ ও মাদক পাচার এখন পুরনো ইস্যু। নতুন করে যুক্ত হয়েছে অস্ত্র চোরাচালান।

গত সোমবার (১৫ জুন) ভোর ৫টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দর্শনা থানাধীন কামারপাড়া গ্রামের একটি আমবাগান থেকে ৭.৬৫ মিলিমিটার বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, এক রাউন্ড গুলি এবং ২ কেজি ভারতীয় গাঁজা উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি ব্যাটালিয়ন।

এভাবে চোরাচালান চলতে থাকলে শুধু সীমান্ত নয়, জাতীয় নিরাপত্তাও ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে। এখনই রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর, সমন্বিত ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মত সচেতন মহলের।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের শীর্ষ স্বর্ণ চোরাকারবারি হিসেবে পরিচিত কিতাব আলীর ছেলে সামাদ দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ, মাদক ও হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

স্থানীয়দের দাবি, এই সীমান্তে কারবার করতে হলে সামাদের অনুমতি লাগে। তার লোকজন চারদিকে সক্রিয়। কেউ বাধা দিতে সাহস পায় না।

স্থানীয়দের ভাষায়, সামাদ ‘স্বর্ণ ও মাদক কারবারি গডফাদার’ হিসেবেই পরিচিত। স্বর্ণ পাচার ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের কেউ কারবারি, কেউ পৃষ্ঠপোষক, আবার কেউ বাহক। চোরাই স্বর্ণ বহনের সময় কালেভদ্রে কিছু বাহক গ্রেপ্তার হলেও চোরাচালান চক্রের গডফাদার সামাদ বরাবরই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

তার নানা অপকর্ম বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ শিরোনামেও উঠে এসেছে— *“চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে চোরাই স্বর্ণের বিশাল সিন্ডিকেট, মূল হোতা গডফাদার সামাদ ধরাছোঁয়ার বাইরে।”*

প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ে দেখা যায়, সামাদ নিজেই স্বর্ণ পাচারে সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছেন। কিছু রেকর্ডিংয়ে তাকে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ যাতায়াত, সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং আটক হওয়া কয়েকটি স্বর্ণের চালান নিজের বলে দাবি করতে শোনা যায়।

অন্য একটি রেকর্ডিংয়ে তার কাছে অস্ত্র থাকার বিষয়ও উঠে এসেছে। এছাড়া আরও একটি ভিডিওতে রাতের অন্ধকারে সীমান্তের কাটাতারের ওপারে গিয়ে ধারণ করা দৃশ্য পাওয়া গেছে। সেখানে তার কণ্ঠে ভারতীয় সীমান্ত এলাকার দৃশ্য দেখানোর কথাও শোনা যায়। আরেক ভিডিওতে তাকে একটি ধারালো দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করতে দেখা গেছে, যা চক্রটির সহিংস সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে সামাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বলেন, “এত বড় অভিযোগের পরও যদি কেউ ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে, তাহলে প্রশ্ন তো উঠবেই—সে কীভাবে এত শক্তিশালী?”

দুঃখজনক হলেও সত্য, কুখ্যাত স্বর্ণ চোরাকারবারি সামাদ প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও প্রশাসনের গাফিলতির কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন কল রেকর্ড ও ভিডিও ডকুমেন্ট থাকা সত্ত্বেও সামাদ ধরা না পড়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সামাদের মতো চোরাকারবারিরা যদি পুলিশের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে, তাহলে যুবসমাজ দিন দিন বিপথে যাবে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গোপনে তদন্ত করে সামাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং তার সহযোগী অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত সামাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সামাদকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে চাঞ্চল্যকর সব তথ্যের পাশাপাশি তার কাছে থাকা স্বর্ণ, অস্ত্র ও গুলির সন্ধান পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টির প্রতি সুনজর দিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে চুয়াডাঙ্গা জেলার পুলিশ সুপার ও চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।

এখনও অধরা,গডফাদার সামাদ,স্বর্ণ চোরাচালান,দর্শনা সীমান্ত
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত