
স্কুল ফিডিং কর্মসূচির সফলতায় রংপুরে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী উপস্থিতির হার উৎসাহব্যঞ্জকভাবে শতভাগ বেড়েছে। সেই সঙ্গে কমেছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের হার। এই কর্মসূচির সফলতায় এর সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সময়ে অব্যাহত রাখার দাবি তুলেছেন সচেতন মহল ও অভিভাবকরা।
এই আকর্ষণীয় খাদ্যবান্ধব পুষ্টি কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন জেলার সুবিধাভোগী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুধ, কলা, বনরুটি ও সিদ্ধ ডিম দেওয়া হচ্ছে।
সেই সঙ্গে খাদ্য-পুষ্টির অনাবিল আকর্ষণে নিয়মিত দলবেঁধে বিদ্যালয়ে আসছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। কখনও কখনও তাদের উপস্থিতি শতভাগে গিয়ে দাঁড়ায়। এই কর্মসূচির সাফল্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পুষ্টিহীনতা রোধেও এটি বিশেষভাবে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
জানা গেছে, এই কর্মসূচির আওতায় রংপুরের ৮ উপজেলার মধ্যে কেবল সদর উপজেলার মোট ২২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৩ হাজার ৬১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিদ্যালয় চলাকালীন নিয়মিত সিদ্ধ ডিম, দুধ, বনরুটি ও কলা বিতরণ করা হচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়তা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)।
এই কর্মসূচির সফলতা দেখার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুর্শিদা শারমিন এ বছরের জুন মাস নাগাদ রংপুরের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। স্কুল ফিডিংয়ের সুফলে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী প্রবণতায় শতভাগ উপস্থিতি দেখে তিনি বিমুগ্ধ ও সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় একই বিভাগের উপসচিব সরওয়ার কামাল ও সিনিয়র সহকারী সচিব ইমতিয়াজ মোরশেদ, ইএসডিওর সদর উপজেলার কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ খাদেমুল ইসলাম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা ও রংপুরের বিশেষ টিমের সদস্যবৃন্দসহ অন্যান্যেরা এসব পরিদর্শন কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন।
রংপুর নগরীর উপকণ্ঠে সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আমাশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রায় শতভাগ। খাওয়ার নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীরা সুশৃঙ্খল সারিবদ্ধভাবে তাদের ওই দিনের বরাদ্দ বনরুটি ও সিদ্ধ ডিম সংগ্রহ করছে।
এ সময় তৃতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী ইয়াছি আক্তার, অম্পিতা, আবু বকর এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিশিথা আক্তার জানায়, তাদের স্কুলে প্রতিদিন এসব খাবার দেওয়ায় সবাই খুশি। বৃষ্টি আর রোদ ভেঙে তারা স্কুলে আসে। স্কুলেই খাবার পেয়ে ক্ষুধা নিবারণ হওয়ায় কেউ আর বাড়ি যায় না বা ক্লাস ফাঁকি দেয় না।
অভিভাবক নয়ন তারা, বেলি বেগম ও ফউজিয়া বেগম জানান, এখন আর তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার কথা বলতে হয় না। বাচ্চারা নিজেরাই স্কুল ফিডিংয়ের খাবারের আকর্ষণে উৎসাহ নিয়ে নিয়মিত স্কুলে যায়।
বিদ্যালয়ের টিফিন ম্যানেজার সহকারী শিক্ষক আব্দুস সবুর জানান, এ বছর স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু হওয়ায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রায় শতভাগ বেড়েছে। আমরা প্রতিদিন ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর টিফিন হিসাব করলেও যেদিন শতভাগ উপস্থিত হয়, সেদিন ঘাটতি পড়ে যায়। যা তাদের পরে পূরণ করে দেওয়া হয়।
আমাশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মল্লিকা রায় জানান, আমাশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৪৬২ জন। স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু হওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৯৫ শতাংশ থেকে প্রায় শতভাগ বেড়েছে। যা পূর্বে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ছিল।
এই বিদ্যালয়ে ১ জন পুরুষ ও ১০ জন নারীসহ মোট ১১ জন শিক্ষক রয়েছেন। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে এই কর্মসূচি চালু হওয়ার পর সবার মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অপ্রয়োজনে কোনো শিক্ষার্থী স্কুলে অনুপস্থিত থাকে না।
প্রধান শিক্ষিকা এই কর্মসূচিকে শিক্ষাবান্ধব যুগান্তকারী উল্লেখ করে বলেন, এতে শিক্ষার্থীদের পুষ্টিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্য তালিকায় একঘেয়েমি রুটির পরিবর্তে বিস্কুট এবং মৌসুমি ফল সংযোগ করলে আরও ভালো হতো।
রংপুর সদর উপজেলার জাফরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচি পরিদর্শনকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে ইতিবাচক নানা কথা জানা গেছে। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমা আক্তার জানায়, তারা এখন নিয়মিত স্কুলে আসে এবং স্কুল শুরু হওয়ার আগেই পৌঁছায়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দিন বনরুটি, সিদ্ধ ডিম, দুধ ও কলা পেয়ে থাকে।
একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী হেলেনা আক্তার জানায়, স্কুলে খাবার দেওয়ার পর থেকে তার অনেক ভালো লাগে। আগে স্কুলে আসতে অনীহা ছিল, এখন সেটি নেই। সারাদিন থাকলেও কোনো সমস্যা হয় না। কারণ দুপুরে খাবার পেয়ে শরীরের ক্ষুধা ও ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
অভিভাবক মৌসুমী আক্তার বলেন, এখন ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, তার সন্তান বাড়িতে আর থাকতে চায় না। ছাতা নিয়ে হলেও বিদ্যালয়ে যায়। পড়াশোনায় মনোযোগ বেড়েছে। আগে স্কুলে পাঠাতে নানা সমস্যা হতো।
প্রধান শিক্ষক তহমিনা খাতুন জানান, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু হওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি শতকরা ৯০ শতাংশের বেশি হয়েছে। বিদ্যালয়ে যেমন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ও আগ্রহ বেড়েছে। এছাড়াও সরকারের এই কর্মসূচি পুষ্টিহীনতা রোধে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
বাস্তবায়নকারী সংস্থা ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) হেড অব প্রোগ্রাম ও স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ফোকাল পার্সন যামিনী কুমার রায় জানান, এই প্রকল্পের ফলে শিক্ষার্থীরা যেমন খুশি, তেমনি শিক্ষা ক্ষেত্রে দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরবরাহকারী সংস্থা হিসেবে ইএসডিও খাবারের মান ও পরিমাপের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর আইউব হোসেন জানান, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলোতে তারা খাবার পৌঁছে থাকেন। গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখতে টেকনিক্যাল কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করে থাকেন। কখনও কোনো অভিযোগ এলে সেটি আমলে নিয়ে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহনাজ বেগম জানান, উপজেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই কর্মসূচি চালু থাকায় শিক্ষাবান্ধব ভিন্ন আমেজের পরিবেশ এসেছে। উপস্থিতির হার বেড়ে বিদ্যালয়গুলোতে ঝরে পড়া রোধ হয়ে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে আনন্দমুখর অনুকূল শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রকল্প সব উপজেলায় সম্প্রসারিত হলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, জেলার কেবল সদর উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু রয়েছে। এই কর্মসূচি চালু হওয়ায় বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি ও উপস্থিতি বেড়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে এটি কাজ করছে এবং এর সুফল সবাই ভোগ করছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, শুধু এই উপজেলা নয়, গোটা জেলায় এই কর্মসূচি চালু হলে প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিসহ তাদের স্কুলে আসার আগ্রহ এবং শিক্ষার গুণগত মান আরও বৃদ্ধি পাবে।