
কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) নির্মিত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ২ ডব্লিউ ও ৪ এক্সটেনশন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন তিনি।
পরিদর্শনকালে মীর শাহে আলম বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। একই সঙ্গে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবে।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রায় ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৫০৩টি উপজেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার ও হাটবাজারসহ মোট ৬ হাজার ৫৪৪টি প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ নিজেদের ব্যবহারের জন্য এবং অতিরিক্ত আরও প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে বরাদ্দের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আমরা হিসাব করে দেখেছি, ৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য খরচ হবে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো। অতিরিক্ত কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা এ কাজে উৎসাহিত হয়।’
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব আয়ের অর্থ কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ হাটবাজার থেকে ৫ শতাংশ এবং ভূমি রেজিস্ট্রেশন থেকে ১ শতাংশ আয় পায়। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনেরও নিজস্ব আয় রয়েছে। এসব আয়ের অর্থের সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ যুক্ত করে আরও বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।’
মীর শাহে আলম বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার যে ৩৭০ কোটি টাকা দিয়েছে, তার সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা যোগ করতে পারবে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। আমরা প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দিতে চাই।’
বিশেষ প্যাকেজের সুবিধা গ্রহণের সময়সীমা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে আগে যে চুক্তি হয়েছে, সেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ৭ টাকা ৯০ পয়সা। কিন্তু নতুন ঘোষিত প্যাকেজের আওতায় আমরা প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাব। তবে এই সুবিধা নিতে হলে ২০২৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এরপর এই বিশেষ প্যাকেজ আর থাকবে না।’
এর আগে উখিয়ার ২ ডব্লিউ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বি-৬ ব্লকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পরিচালিত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ফেকাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী।
এ প্রকল্পে ক্যাম্পে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। জৈব বর্জ্য পরিশোধনের মাধ্যমে কম্পোস্ট সার উৎপাদন করে তা উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। প্রকল্পে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। প্ল্যান্টের নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৭০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রুফটপ সোলার প্যানেলের মাধ্যমেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।
উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র পরিদর্শনের কারণ জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমি এই প্রকল্পটি দেখতে এসেছি। একটি বৈঠকে আমরা প্রকল্পটির কথা জানিয়েছিলাম। তিনি সরেজমিনে দেখে আসতে বলেছেন। এখন পর্যন্ত আমার কাছে প্রকল্পটি কার্যকর ও যুক্তিসংগত মনে হচ্ছে। তবে কিছু বিষয় হয়তো সংযোজন-বিয়োজন করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে সেগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
পরে প্রতিমন্ত্রী ক্যাম্প-৪ (বর্ধিত) এলাকার এফ ব্লকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন। সেখানে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ফেকাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট, বর্জ্য থেকে জৈব সার ও কয়লা প্রস্তুত এবং ডিস্টিল্ড ওয়াটার উৎপাদন প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এসব কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য নেন তিনি। প্রকল্প দুটির সামগ্রিক কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
ক্যাম্প-৪ (বর্ধিত) এলাকার প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধন করা হয় এবং একই বছরের নভেম্বরে কার্যক্রম শুরু হয়। এ প্রকল্পে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ মূলত প্রকল্প পরিচালনার কাজেই ব্যবহৃত হয়।
কক্সবাজার পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কক্সবাজার পৌরসভার একটি প্রকল্প আমি গতকাল পরিদর্শন করেছি। সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজটি এখনো স্বয়ংক্রিয় নয়, ম্যানুয়ালি করা হচ্ছে। এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আমাদের যে পদ্ধতি, সেখানে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হবে। বাকি কিছু কাজ বাইরে থেকে ম্যানুয়ালি করতে হতে পারে।’
কক্সবাজারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে চীনের সিএমইসি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইতোমধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, সেখানে প্রতিদিন ৩ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় ৪৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও চীনের উইমীম নামে একটি প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেও যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠান বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ করবে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ফিনল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে।
এ সময় কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদ, অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (উপসচিব) মো. নাজমুল ইসলাম, ক্যাম্প-ইন-চার্জ মো. আল ইমরান, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী জামানুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নসরুল্লাহ, সহকারী প্রকৌশলী জি. এম. মুকতাদির, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম, উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী, উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান, উখিয়া পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম কাইজার নুরসহ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।