
মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বিবিরহাট নামের শতবর্ষী একটি ঐতিহ্যবাহী বাজার। একসময় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকা বাজারটি এখন অনেকটাই জনমানবশূন্য। নদীভাঙনের শিকার হয়ে ওই এলাকার মানুষ অন্যত্র বসতি স্থাপন করায় এলাকাটিতে অল্পসংখ্যক মানুষ বাস করছে। ফলে বন্ধ হওয়ার পথে শত বছরের এই বাণিজ্যকেন্দ্র।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দশক ধরে বাজারটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাবেচার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আসতেন বাজারে। দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা আসতেন বিভিন্ন পণ্য কিনতে। বাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মানুষের জীবিকার মাধ্যম। বর্তমানে ওই বাজারে ১ হাজার ২০০ দোকান রয়েছে। ঐতিহ্যের এ বাজারটি তার পুরোনো রূপ হারাতে বসেছে।
বিবিরহাট এলাকার তিনজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রামগতি উপজেলার চররমিজ ইউনিয়নে অবস্থিত এ বাজারটি ওই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী হাট ছিল। এটি ব্রিটিশ শাসনামল বা তারও পূর্বে মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৯৩০ সালের দিকে বিবিরহাট বাজারটি অত্যন্ত জমজমাট ও সুপরিচিত একটি হাট ছিল। সে সময় এটি এ অঞ্চলের বৃহত্তম পশুর হাট (গো-বাজার) এবং দৈনন্দিন কেনাবেচার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল।
চট্টগ্রামের মাদাম বিবিরহাটের পর বৃহত্তর নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার সর্ববৃহৎ গরুর বাজার ছিল এ হাটে। তখন বাজারটির নাম ছিল দারোগার হাট। মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে বর্তমান বাজার থেকে উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের দক্ষিণ চরআলগী, কাটাবুনিয়া, চরলাড্ডু, লম্বাখালি, মধ্য চরআলগী, সেবাগ্রাম ও বিবিরহাট হাট অংশের প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়।
এতে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি বসতবাড়ি নদীতে ভেঙে গেলে মানুষ অন্যত্র গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। এতে এলাকাটি জনমানবশূন্য হয়ে পড়লে বাজারটি নুরজাহান বিবি নামে বিখ্যাত এক নারীর বাড়ির দরজায় স্থানান্তর করা হয়। তার নামানুসারে এই হাটের নামকরণ করা হয়েছিল ‘বিবিরহাট’। বর্তমানে এটি সবার কাছে বিবিরহাট নামে পরিচিত এবং সরকারের নথিপত্রেও রেকর্ডভুক্ত।
বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, আগে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্রেতার সমাগম হতো। এখন এলাকায় তেমন মানুষ নেই। তাছাড়া রাস্তার মোড়ে মোড়ে দোকানপাট হওয়ায় মানুষ বিবিরহাট বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। এতে বাজারটি ক্রেতা-বিক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে একসময়ের জমজমাট বাজারটি ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বাজারটি শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এলাকার শত বছরের ইতিহাস, মানুষের জীবিকা ও সামাজিক যোগাযোগের স্মৃতি। নদীভাঙনের কারণে বাজারটি পুরোপুরি ক্রেতাশূন্য। এতে ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের পাশাপাশি আশপাশের মানুষও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাবেচার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হারাবেন। অনেক ব্যবসায়ী দোকান সরিয়ে নিচ্ছেন। যারা এখনও ব্যবসা করছেন, তারাও রয়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
কথা হয় বিবিরহাটের মায়ের দোয়া হোটেলের মালিক বেলাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, একসময়ের জমজমাট বাজার এখন প্রায় মৃত। দিনের বেলায় সর্বোচ্চ দুই শতাধিক মানুষ ওঠেন। বেচাকেনা না থাকায় বেশিরভাগ দোকান বন্ধ থাকে। সারাদিনে মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি করেছেন। এ টাকা দিয়ে হোটেলের খরচ তো দূরের কথা, স্টাফদের বেতনও দিতে পারবেন না।
পান ব্যবসায়ী স্বপন বলেন, ঐতিহ্যবাহী বাজারটি আগে জমজমাট থাকলেও এখন শুনশান নীরবতায় রয়েছে। মানুষ না থাকায় সবগুলো দোকানপাট বন্ধ। সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ৩০০ টাকাও বিক্রি হয়নি। কীভাবে সংসার চালাবেন, সেই চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
আরেক ব্যবসায়ী হাসান মাহমুদ বলেন, নদীভাঙনে মানুষ বসতি স্থানান্তরিত করে বিভিন্ন জায়গায় চলে যাওয়ায় এলাকাটি জনমানবশূন্য। তাই বাজারে মানুষ নেই। যেকোনো সময় ইতিহাস-ঐতিহ্যে জড়িত এ বাজারটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
চররমিজ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি অফিসটিও বাজারের বাইরে করা হয়েছে। এ দুটি অফিসকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ আসা-যাওয়া করলে বাজারটি মোটামুটি জমজমাট থাকত। তবুও মানুষকে বাজারমুখী করতে হলে সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি ও সীমিত দাম নির্ধারণ করে পরিকল্পনা করলে আশা করা যায়, মানুষ কিছুটা হলেও বাজারমুখী হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, শত বছরের ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের স্মৃতিবিজড়িত একটি জনপদ এভাবে জনমানবশূন্য হওয়াটা দুঃখজনক। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাজার কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে সাধারণ মানুষকে বাজারমুখী করতে পদক্ষেপ নেবেন তিনি।