ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ঋণখেলাপিদের নাম-ছবি প্রকাশে অনুমতি চেয়েছে এবিবি

ঋণখেলাপিদের নাম-ছবি প্রকাশে অনুমতি চেয়েছে এবিবি

খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। একই সঙ্গে ঋণখেলাপিদের উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পাওয়ার সুযোগ আইনিভাবে রহিত করার ব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

পাশাপাশি বন্ধকি সম্পদের ডেটাবেজ প্রণয়ন, নিলামে বন্ধকি সম্পদ বিক্রি সহজ করা এবং ঋণখেলাপিদের বিদেশ যেতে ব্যাংক বা আদালতের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতাসহ একাধিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সম্প্রতি এসব প্রস্তাব জমা দিয়েছে এবিবি। সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে পাঁচ ধাপে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়েছে। গভর্নর বরাবর দেওয়া ওই চিঠির অনুলিপি ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগেও পাঠানো হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক বৈঠকে খেলাপি ঋণ কমাতে করণীয় বিষয়ে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের প্রস্তাব দিতে বলা হলে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তারা লিখিতভাবে মতামত উপস্থাপন করেন।

ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ঋণ বর্তমানে খেলাপি অবস্থায় রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

জানা গেছে, ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে ৩০ শতাংশে নেমেছে, তবে ওই সময়ের বিস্তারিত হিসাব এখনো প্রস্তুত হয়নি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সে হিসাবে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা, যা দ্বিগুণেরও বেশি। খেলাপি ঋণের উচ্চহার অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অনেক লুকানো খেলাপি ঋণ প্রকাশ্যে আসছে, যা আগের সরকারের আমলে নিয়মিত দেখানো হতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা চাইলে ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের অনুমোদন দিতে পারে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে ব্যাংককে সেই সুযোগ দেওয়া আছে। ঋণখেলাপিদের জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যদিও অনেক খেলাপি আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা নেই।

এমডিদের প্রস্তাবনায় প্রথম ধাপে খেলাপি ঋণ তাৎক্ষণিক কমানোর উপায় তুলে ধরা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খেলাপি ঋণ আংশিক অবলোপনের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। লিয়েনকৃত শেয়ার নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং একক মালিকানাধীন কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সুদ মওকুফের মাধ্যমে দ্রুত ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধানের মতামত নেওয়ার শর্ত তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধে উদ্বুদ্ধ করতে তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক বা আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমোদন এবং তাদের যে কোনো ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা।

তৃতীয় ধাপে বন্ধকি সম্পদ বিক্রয়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদারের ছয়টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে নিলামে বিক্রয় বা ক্রয় করা সম্পত্তি হস্তান্তরে সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। নিলামে সম্পদ কেনায় আগ্রহ বাড়াতে ক্রেতাদের আয়কর রেয়াত বা অন্যান্য প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

স্থানভেদে নিলামে বিক্রি করা সম্পদ ক্রয়ে জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বাতিল, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত, বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতেও জমির খাজনা ও জরিপ সম্পন্নের সুবিধা প্রদান এবং আদালত থেকে ব্যাংকের নামে মালিকানা হস্তান্তরিত জমির নামজারি ও বয়নামা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পরবর্তী ধাপে খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা পরিচালনা সহজ করা ও রায় দ্রুত কার্যকরের বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও জামানতদাতাদের ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, মালিকানাধীন সম্পদ, আয়কর রিটার্ন, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম ও মৃত্যু সনদ এবং পাসপোর্টসংক্রান্ত তথ্য আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই চাহিবামাত্র পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

ব্যাংক বা আদালতের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউনপেমেন্ট জমা দেওয়ার শর্ত আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। সিআইবি প্রতিবেদনের বিপরীতে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পাওয়ার সুযোগ আইনিভাবে রহিত করা এবং স্টে-অর্ডারে কিস্তিভিত্তিক অর্থ পরিশোধের শর্ত নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। শর্ত মানা না হলে আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্টে-অর্ডার বাতিল হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, উচ্চ আদালত থেকে স্টে-অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিত করতে হবে এবং যেসব জেলায় খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি সেখানে দ্রুত আলাদা অর্থঋণ আদালত স্থাপন করতে হবে।

একই সঙ্গে থানায় খেলাপি ঋণসংক্রান্ত আটকাদেশ দ্রুত কার্যকর, আদালত থেকে থানায় সাত দিনের মধ্যে আটকাদেশ পাঠানো, অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগত হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ বাতিল, দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ ছয় মাসের পরিবর্তে ঋণের পরিমাণভেদে সাত বছরে উন্নীত করা এবং স্বল্প সময়ে অর্থঋণ আইনের সংশোধনী প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ ধাপে নতুন খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ঠেকাতে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে প্রকাশ, নিবন্ধক ও তহশিল অফিসে বন্ধকি সম্পদের তালিকা সহজে যাচাইয়ের সুযোগ নিশ্চিত এবং সিআইবি ডেটাবেজের মতো বন্ধকি সম্পদের পৃথক ডেটাবেজ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।

চিঠির শেষাংশে দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে এসব প্রস্তাব বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায় ও ব্যাংকিং খাত পুনরুজ্জীবনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অগ্রণী ভূমিকার প্রত্যাশা করা হয়েছে।

অনুমতি চেয়েছে এবিবি,ঋণখেলাপিদের নাম-ছবি
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত