
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ডিগ্রি মিলছে, কিন্তু চাকরির বাজারে গিয়ে সেই শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কতটা কাজে লাগছে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবার সরাসরি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশল (আইসিই) বিভাগ।
গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে কোম্পানিগুলো ঠিক কী ধরনের জ্ঞান, দক্ষতা ও কাজের সক্ষমতা দেখতে চায়, তা জানার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশেষ শিল্প-একাডেমিয়া সংলাপ।
আজ বুধবার (১৯ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের জামাল নজরুল ইসলাম বিজ্ঞান ভবনের ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং গ্যালারিতে শুরু হয়েছে ‘আইইইই এপিএস পালস ১.০’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা। সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হওয়া এ আয়োজন চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
অ্যান্টেনা প্রযুক্তি, বেতার যোগাযোগ ও আধুনিক প্রকৌশল বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে বাস্তবভিত্তিক সেতুবন্ধন তৈরি করাই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
কর্মশালার মূল আকর্ষণ শিল্প-একাডেমিয়া সংলাপ। এতে গ্রামীণফোন, রবি, ওয়ালটন ও এক্সেল প্রযুক্তিসহ চারটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি আলোচনায় অংশ নিয়ে কর্মক্ষেত্রে একজন নতুন গ্র্যাজুয়েটের কাছে তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে মতবিনিময় করছেন।
পাশাপাশি, গবেষণায় শিল্পখাতের ভূমিকা, গবেষণা অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধা উন্নয়ন এবং যৌথ গবেষণা ও উদ্ভাবনে শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে।
আইইইই এপিএস-এমটিটিএস বাংলাদেশ জয়েন্ট চ্যাপ্টার ও আইইইই এপিএস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী শাখার যৌথ আয়োজনে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে কৌশলগত সহযোগী হিসেবে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) এবং পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে আইইইই এপিএস মেম্বার অ্যান্ড জিওগ্রাফিক অ্যাক্টিভিটিজ (এমজিএ) কমিটি ও এক্সেল প্রযুক্তি।
সংলাপে অনেকটা টেলিভিশনের সরাসরি আলোচনার আদলে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়ে নিজেদের চাহিদা ও প্রত্যাশা তুলে ধরছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরাসরি জানতে চাওয়া হচ্ছে, একজন নতুন গ্র্যাজুয়েটকে নিয়োগ দেওয়ার সময় তার মধ্যে ঠিক কী ধরনের দক্ষতা, জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা দেখতে চায় প্রতিষ্ঠানগুলো।
আয়োজকদের লক্ষ্য শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে চাহিদা জেনে আলোচনা শেষ করা নয়। এসব চাহিদা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি, শিল্পখাতের বাস্তব সমস্যা ও প্রযুক্তিগত চাহিদাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে যৌথ গবেষণা, গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করতে চান আয়োজকরা। অর্থাৎ শিল্পখাতে যে ধরনের দক্ষ জনবল ও গবেষণাভিত্তিক সমাধানের প্রয়োজন, শিক্ষার্থীদের সেই অনুযায়ী প্রস্তুত করে তুলতে একটি কার্যকর শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তুলতে চায় বিশ্ববিদ্যালয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসির পরিচালক অধ্যাপক ড. আবু রেজা বলেন, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতার সুফল পেতে দুই পক্ষের চাহিদা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে পারস্পরিক বোঝাপড়া জরুরি। এবারের সংলাপের মূল লক্ষ্য এ সম্পর্ক আরও কার্যকর করা। ইন্টার্নশিপকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যেন শুধু সনদ নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে, সে বিষয়ে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রতিবছর নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
কর্মশালার আহ্বায়ক ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক ড. ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠের ওপর নির্ভর করে না। পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে তাদের দক্ষতাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি। শিল্পের প্রয়োজনকে একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল পাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বমানের গবেষণার জন্য আধুনিক অবকাঠামো ও শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা জরুরি। অ্যান্টেনা, আরএফ ও মাইক্রোওয়েভ গবেষণায় উন্নত মেজারমেন্ট ল্যাব, ভেক্টর নেটওয়ার্ক অ্যানালাইজার, অ্যানিকোয়িক চেম্বার ও সিমুলেশন সুবিধা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও মেধা দেবে, আর শিল্প দেবে বাস্তব সমস্যা, প্রযুক্তি ও সম্পদ। এই সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশেই ডিজাইন, প্রোটোটাইপ, পরীক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ পাবে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যান্টেনা, আরএফ, মাইক্রোওয়েভ ও ওয়্যারলেস প্রযুক্তি গবেষণার একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।’
দিনব্যাপী কর্মশালায় বিশেষ বক্তৃতা, শিল্প-একাডেমিয়া সংলাপ, হাতে-কলমে অ্যান্টেনা নকশা ডিজাইন প্রশিক্ষণ এবং অ্যান্টেনা নকশা ডিজাইন প্রতিযোগিতার আয়োজন রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অ্যান্টেনা ও বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে বলে জানান আয়োজকরা।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুনুর রশীদ, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির স্কুল অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ডাটা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক আইইইই ফেলো ড. কারু এসেল এবং সৌদি আরবের কিং আবদুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আতিফ শামীম।