ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

২৩ পদের বিপরীতে নজরুল ইনস্টিটিউটে কর্মরত ৩ জন

২৩ পদের বিপরীতে নজরুল ইনস্টিটিউটে কর্মরত ৩ জন

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন নিয়ে গবেষণা এবং তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব ও জনবল সংকটে রয়েছে।

প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ দেওয়া হয়নি স্থায়ী পরিচালক। ২৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন।

এতে গবেষণা, প্রকাশনা, নজরুলের রচনাবলি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের এই সংকটের কারণে নজরুল গবেষণার জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

প্রতিষ্ঠার এক যুগ পরও নেই স্থায়ী পরিচালক

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আট বছর পর ২০১৪ সালে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। নজরুলের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা, পাঠদান, তাঁর রচনাবলি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, প্রকাশনা এবং দেশে-বিদেশে কবির ভাবমূর্তি তুলে ধরার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশে এটিই প্রথম ও একমাত্র নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট। ফলে নজরুলকে নিয়ে মৌলিক ও বহুমাত্রিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রত্যাশাও ছিল ব্যাপক।

তবে প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পরও স্থায়ী পরিচালক না থাকায় সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে স্থায়ী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালক পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে।

২৩ পদের বিপরীতে কর্মরত ৩ জন

ইনস্টিটিউটটির আরেকটি বড় সমস্যা জনবল। অনুমোদিত ২৩টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন।

গবেষণা সহায়তা, প্রশাসনিক কাজ, প্রকাশনা, নথিপত্র ব্যবস্থাপনা এবং নজরুলের রচনাবলি ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সীমিত জনবল দিয়ে পরিচালনা করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শুধু গবেষক নয়, গবেষণা সহকারী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রকাশনা ও তথ্য সংরক্ষণে দক্ষ জনবলও প্রয়োজন। কিন্তু অনুমোদিত পদের বড় অংশ খালি থাকায় নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে নিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় পরিসরের গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।

সব বিভাগে নজরুল স্টাডিজ, গবেষণায় পিছিয়ে

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে ‘নজরুল স্টাডিজ’ বাধ্যতামূলক কোর্স হিসেবে পড়ানো হয়। তবে শ্রেণিকক্ষে নজরুলের সাহিত্য ও দর্শন পড়ানোর পাশাপাশি তাঁকে নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণাধর্মী প্রকাশনার সুযোগ তৈরির দায়িত্বও রয়েছে ইনস্টিটিউটটির।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত গবেষক ও সহায়ক জনবল না থাকায় এই ক্ষেত্রটি এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় বিস্তৃত হয়নি।

নজরুলের অপ্রকাশিত বা দুর্লভ উপাদান সংগ্রহ, আর্কাইভ গড়ে তোলা, নতুন গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ, আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে যৌথ কাজ এবং নিয়মিত মানসম্মত প্রকাশনা—এসব ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

৪০ কোটি টাকার ভবনে যাবে ইনস্টিটিউট

অবকাঠামো সংকট কাটাতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভবনটির একটি অংশে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ভবনটি বুঝে পাওয়ার কথা। ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ ছাড়াও আরও চারটি ইনস্টিটিউট সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ভবন গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হলেও স্থায়ী নেতৃত্ব ও পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা না গেলে অবকাঠামোগত সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হবে না।

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিছু অর্জন

জনবল ও নেতৃত্বের সংকট থাকলেও ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও গ্রন্থ প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন।

ভারতের নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ‘নজরুল জার্নাল’ প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও নজরুল গবেষণার ব্যাপ্তি বিবেচনায় এসব কার্যক্রমের পরিসর আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

‘শুধু ভবন সংকটকে দায়ী করলে প্রকৃত সমস্যা আড়ালে থাকবে’

ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজের অতিরিক্ত পরিচালক রাশেদুল আনাম আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, “স্থায়ী পরিচালক না থাকা এবং অনুমোদিত পদের তুলনায় কমসংখ্যক জনবল থাকার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই বলতে পারবে।”

তিনি বলেন, সীমিত জনবল নিয়েই ইনস্টিটিউটের নিয়মিত গবেষণা, প্রকাশনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. হাবিব-উল-মাওলা বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পর্যাপ্ত জায়গা ও অবকাঠামোর অভাবকে ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পরিচালনার বড় বাধা হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে শুধু জায়গা বা ভবন সংকটকে দায়ী করলে প্রকৃত সমস্যা আড়ালে থেকে যাবে।

তিনি বলেন, একাডেমিক পর্যায়ে নজরুলকে যথাযথভাবে ধারণ করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাঁর দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে।

অধ্যাপক হাবিব-উল-মাওলা আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদটি সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ার সঙ্গে যুক্ত, যা অন্যান্য পরিচালকের ক্ষেত্রে নেই। দীর্ঘদিনেও এ পদে স্থায়ী নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ার কারণ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

নজরুল সাহিত্য নিয়ে কাজ করা যোগ্য সাহিত্যিক বা গবেষকদের মধ্য থেকেও পরিচালক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

তাঁর মতে, শুধু পরিচালক নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। কেবল একটি অর্থবছর পার করার দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।

‘অভিজ্ঞ নজরুল গবেষককে পরিচালক করা হবে’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, “আমি নতুন এসেছি। ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।”

তিনি বলেন, ইনস্টিটিউটটির জন্য নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ বছরের মধ্যে ভবনটি হস্তান্তরের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবন প্রস্তুত হলে ইনস্টিটিউটটি সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

স্থায়ী পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, নজরুল গবেষণায় অভিজ্ঞ কোনো গবেষক বা বিশেষজ্ঞকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।

নজরুল গবেষণার জন্য দেশে প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত এই প্রতিষ্ঠানটির ১২ বছরের পথচলায় কিছু সাফল্য থাকলেও স্থায়ী নেতৃত্ব ও জনবল সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন ভবনের পাশাপাশি এসব সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ইনস্টিটিউটটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের পরিসর।

কর্মরত ৩ জন,নজরুল ইনস্টিটিউট,২৩ পদ
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত