ঢাকা রোববার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

কাবিননামার ধারা ১৮ পূরণে প্রচলিত ভুল

কাবিননামার ধারা ১৮ পূরণে প্রচলিত ভুল

কাবিননামার ধারাগুলোর মধ্যে স্ত্রীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো ১৮নং ধারা। এতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এটি স্ত্রীর জন্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে খুবই কাজে দেয়। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এ ধারাটি পূরণ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে অনেক সময়ই বিভিন্ন ধরনের ভুল ও শরিয়ত পরিপন্থী কার্য সংগঠিত হয়ে থাকে। ফলে দেখা যায়, বিয়ের পর স্ত্রীরা অহরহ তালাক গ্রহণ করে থাকে। সামান্য কারণে হুট করে স্বামীকে তালাকের নোটিশ বা ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেয়। রাগের মাথায় স্বামীকে বলে দেয়, ‘আমি আপনার থেকে তালাক!’ রাগ শেষ হলে আবার একসঙ্গে ঘর-সংসার করতে চায়। কিন্তু তখন আর কোনো উপায় থাকে না। তখন নিজেরা আফসোস করে সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন করতে হয়। আবার অনেক মেয়ে পরকীয়া আসক্ত হয়ে স্বামীর ওপর মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেয়। যেটা স্বামী বেচারার ওপর সীমাহীন জুলুম। এর থেকে বাঁচার উপায় হলো, সঠিকভাবে এ ধারাটি পূরণ করা এবং এ সংক্রান্ত যেসব ভুল-ভ্রান্তি রয়েছে, তা থেকে বেঁচে থাকা। সেগুলো হলো-

১. স্বামীকে তালাক দিলাম বলা বা লেখা : কাবিননামার ১৮নং ধারায় স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে স্ত্রী যখন তালাক গ্রহণ করে, তখন অনেক ক্ষেত্রে তালাকপত্রে বিষয়টি এভাবে লেখা হয়, ‘আমি আমার স্বামী অমুককে তালাক দিলাম’ বা ‘প্রদান করলাম’। এভাবে তালাক দেওয়ার পর অনেক সময় স্ত্রী অন্যত্র বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসার করা আরম্ভ করে। এটি একটি মারাত্মক ভুল। কেননা, শরিয়তের দৃষ্টিতে তালাক প্রদানের ক্ষমতা কেবল স্বামীর, স্ত্রীর নয়। তবে স্বামীর দেওয়া ক্ষমতাবলে স্ত্রী নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করতে পারে; স্বামীকে তালাক দিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী নিজের ওপর তালাক গ্রহণের পরিবর্তে স্বামীকে মৌখিক বা লিখিতভাবে তালাক দিলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা কার্যকর হয় না; বরং স্বামীর সঙ্গে তার বিয়েবন্ধন পূর্বের মতোই বহাল থাকে।

সুতরাং উক্ত অগ্রহণযোগ্য তালাকের ভিত্তিতে স্ত্রীর জন্য অন্য পুরুষের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং ওই পুরুষের সঙ্গে একত্রে বসবাস করা সম্পূর্ণ হারাম হবে। অতএব, ১৮নং ধারায় উল্লিখিত শর্ত যথাযথভাবে পাওয়া গেলে এবং সব দিক বিবেচনায় বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে স্ত্রী তালাক গ্রহণের কথা এভাবে বলবে বা লিখবে, ‘আমি কাবিননামার ১৮নং ধারায় স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিজ নফসের ওপর এক তালাকে বায়েন গ্রহণ করলাম।’ ‘অমুককে তালাক দিলাম’ বা ‘ডিভোর্স দিলাম’ এ ধরনের শব্দ বলবে না এবং লিখবেও না। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের উচিত, উকিল বা তালাক রেজিস্টারদের তালাকপত্র লেখার সময় বিষয়টির প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখা।

তাবেয়ি মানসুর (রহ.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলেছে, ‘তোমার তালাক গ্রহণের ক্ষমতা তোমার হাতে।’ এ কথা শুনে স্ত্রী বলল, ‘আপনি তিন তালাক।’ এ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা তাকে বৃষ্টি না দিন (অর্থাৎ তার উদ্দেশ সফল না হোক)।’ যদি সে (ওভাবে না বলে) বলত, ‘আমি তিন তালাক’, তাহলে যা বলেছে তা-ই হতো।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৯/৫৮২; আল-বাহরুর রায়েক : ৩/৩৪৩; বাদায়েউস সানায়ে : ৩/১৮৭)।

তাই আমাদের দেশের কাবিননামার উক্ত ধারার ভাষ্যটিও সঠিক নয়। কেননা, তাতে লেখা আছে, ‘স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করিয়াছে কি না? করিয়া থাকিলে কি কি শর্তে?’ সম্ভবত এখান থেকেই উক্ত ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, স্বামী স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দিলে স্ত্রী স্বামীকেই তালাক দিতে পারে। এখানে কথাটা এভাবে লেখা উচিত ছিল, ‘স্বামী স্ত্রীকে নিজ নফসের ওপর তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অপর্ণ করিয়াছে কি না?’ অথবা এভাবেও লেখা যেত, ‘স্বামী স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করিয়াছে কি না?’ পারিবারিক আদালতে এ বিষয়টি আমলে নেওয়া উচিত।

উল্লেখ্য, আলোচ্য ক্ষেত্রে কোনো কোনো সাহাবি ও তাবেয়ি থেকে এক তালাক কার্যকর হওয়ার কথাও বর্ণিত আছে। যদিও হানাফি মাজহাবের ফতোয়া এর ওপর নয়। কিন্তু সাহাবি ও তাবেয়ির উক্ত অভিমতের কারণে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। তাই কোনো স্ত্রী যদি কাবিননামার ক্ষমতাবলে ভুলভাবে নিজে তালাক গ্রহণ না করে স্বামীকে তালাক দেয়, এরপর তারা পুনরায় একত্রে ঘর-সংসার করতে চায়, তবে সতর্কতামূলক বিয়ে দোহরানো উচিত।

২. ১৮নং ধারায় শুধু ‘হ্যাঁ’ শব্দ কিংবা ‘না’ শব্দ লেখা : অনেকে কাবিননামার ১৮নং ধারায় শুধু ‘হ্যাঁ’ শব্দটি লিখে দেয়। এটাও ভুল। কেননা, এতে স্ত্রী নিঃশর্তভাবে তালাক গ্রহণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়। আর স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান যদিও শর্তযুক্ত বা শর্তহীন দু’ভাবেই হতে পারে; কিন্তু নিঃশর্ত ক্ষমতা প্রদানের ক্ষেত্রে যেহেতু ঝুঁকি রয়েছে, তাই এমনটি করা আদৌ ঠিক নয়। সুতরাং এতে ভারসাম্যপূর্ণ শর্ত যুক্ত করা বাঞ্ছনীয়। আবার অনেক সময় পাত্রপক্ষ শুধু ‘না’ শব্দ লিখে দেয় ও পাত্রীপক্ষ তাতে দ্বিমত পোষণ করে না। বর্তমান ফেতনা-ফাসাদের যুগে এটাও মারাত্মক ভুল। কেননা, এতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর ওপর জুলুম হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৩. ১৮নং ধারাটি খালি রেখে দেওয়া : অনেক ক্ষেত্রে কাবিননামার ১৮নং ধারাটি পূরণ না করে ফাঁকা রেখে দেওয়া হয়। এটা মোটেও ঠিক নয়। কারণ, মুসলিম বিয়েবিচ্ছেদ আইনে যে ৯টি কারণে বিয়েবিচ্ছেদের অনুমতির কথা বলা আছে, তার কোনোটি না থাকলে এবং খোলার মাধ্যমেও স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ না পেলে একজন স্ত্রীর পক্ষে বিয়েবন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে কাবিননামার ১৮নং ধারায় স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ না করে, তাহলে স্ত্রী নিজে তালাক গ্রহণ করতে পারে না। অথচ স্বামীর প্রতারণা বা জুলুমের কারণে স্ত্রীর কখনও তালাক গ্রহণের মাধ্যমে নিজ থেকে বিয়েবিচ্ছেদ ঘটানোর প্রয়োজন হয়।

উক্ত অসুবিধার কথা চিন্তা করেই মূলত কাবিননামায় ১৮নং ধারাটি সংযোজন করা হয়েছে। যাতে স্ত্রী অপেক্ষাকৃত কম জটিলতায় তালাকে তাফঈযের মাধ্যমে মুক্তি পেতে পারে। এজন্য উক্ত ধারাটি পূরণ করা উচিত। অনেকে এ বিষয়টি সম্পর্কে না জানার কারণেও ধারাটি শূন্য রাখে। তাই কাবিননামা পূরণের সময় কাজীদের অবশ্যই দু’পক্ষকে এ ধারা সম্পর্কে বিশেষভাবে জানানো উচিত।

৪. সুন্নত তরিকায় বিয়ের আগেই কাবিন করে ফেলা : আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, বিয়ের বহু আগেই অনেকে কাবিন করে রাখে। আবার অনেক সময় সরকারি কাজী বিয়ের মজলিসে ইজাব-কবুল সংঘটিত হওয়ার আগেই সময় না থাকা বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে কাবিনের ফরম পূরণ করে ফেলে এবং বর-কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। এটা নিতান্ত ভুল কাজ। কেননা, কাবিননামা হলো, প্রচলিত আইন অনুসারে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন। তাই শরিয়তের বিধান হলো, কাবিন করতে হলে পূর্বে নিয়মমাফিক বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। তারপর নির্ধারিত কাবিননামার ফরম পূরণ করবে। এ সংক্রান্ত সরকারি আইনও এ কথাই বলে যে, বিয়ের পরে ফরমটি পূরণ করত সংঘটিত বিয়েকে সরকারি রেজিস্টারভুক্ত করবে। কেননা, বিয়েই যদি সম্পাদিত না হয়ে থাকে, তাহলে রেজিস্ট্রেশন ও নিবন্ধন কিসের হবে? সুতরাং বিয়ের আগে কাবিন করা একে তো আইনসিদ্ধ নয়, দ্বিতীয়ত এ ক্ষেত্রে আরও কিছু বড় বড় সমস্যা রয়েছে।

যেমন- কাবিননামার যে ফরমটি পূরণ করতে হয়, তাতে অনেকগুলো ধারা রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি হলো, কতো তারিখে বিয়ে সম্পাদিত হয়েছে? কোথায় বিয়ে পড়ানো হয়েছে? বিয়ে কে পড়িয়েছেন? বিয়ে পড়ানো ছাড়া কাবিন করা হলে ফরমের এ ধারাগুলোতে মিথ্যা তথ্য লিখতে হয়। কেননা, বিয়ে না হওয়ায় বিয়ে সম্পাদনের তারিখ, স্থান ও বিয়ে পড়ানেঅলা- সবকিছু বানিয়ে লিখতে হবে। এক কথায়, বিয়ের আগে কাবিন করার দ্বারা পাত্র-পাত্রী, সাক্ষী, সনাক্তকারী, সরকারি নিবন্ধক কিংবা কাজি- সবাই মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে। সবাই মিথ্যা কথার ওপর স্বাক্ষর করছে।

উপরিউক্ত মিথ্যা তথ্য লেখা ছাড়াও বিয়ের আগে কাবিন করার ক্ষেত্রে আরেকটি জটিল সমস্যা হচ্ছে, কাবিননামার ১৮নং ধারা পূরণের মাধ্যমে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা। বিয়ের পর যেমনিভাবে স্বামী নিজে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের অধিকার লাভ করে, তদ্রুপ স্ত্রীকেও তালাক গ্রহণের অধিকার দিতে পারে।

কিন্তু বিয়ের আগে যেহেতু স্বামী নিজেই তালাক প্রদানের অধিকার রাখে না, তাই স্ত্রীকেও সেই অধিকার দিতে পারে না। দিলেও স্ত্রীর জন্য উক্ত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। কেননা, বিয়ে হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বামী তার স্ত্রীর জন্য পরপুরুষ। আর কোনো পরপুরুষ তো পরনারীকে তালাক দিতে পারে না। দিলেও তা অনর্থক ও অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয়।

অতএব, পাত্র যদি বিয়ের আগে কাবিননামার ফরম পূরণকরত, তাতে স্বাক্ষরও করে, তবুও এর দ্বারা বিয়ের পর পাত্রী তালাক গ্রহণের অধিকারপ্রাপ্ত হবে না। এমতাবস্থায় স্ত্রী যদি সেই অধিকার বলে কোনোদিন নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করে, তবে তার তালাক গ্রহণ শরিয়ত মতে শুদ্ধ হবে না। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, বিয়ের আগে করা কাবিনের ভিত্তিতেই স্ত্রী ডিভোর্স নিয়ে নেয় এবং অন্যত্র বিয়েও করে ফেলে। অথচ তার ডিভোর্স গ্রহণ কার্যকর না হওয়ায় অন্যত্র বিয়ে বসা বৈধ হয় না। এ ক্ষেত্রে ডিভোর্স নেওয়ার পরও সে আগের স্বামীরই স্ত্রী থেকে যায়।

বিয়ের আগে কাবিন করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় মন্দ দিক হলো, অনেকে এ কাবিনকেই বিয়ে মনে করে। ফলে মৌখিকভাবে বিয়ের ইজাব-কবুল না করে শুধু কাবিন করার দ্বারাই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেছে বলে ধরে নেয়। অথচ স্বাক্ষীদের সামনে মৌখিক বা লিখিত ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু কাবিন করার দ্বারা কখনোই বিয়ে সংঘটিত হয় না। ফলে বর-কনের একত্রে থাকাও বৈধ হয় না।

এ ছাড়া অনেকে কাবিনকে বিয়ে মনে না করলেও কাবিন করার পর ছেলে-মেয়ের পরস্পর কথাবার্তা, দেখা-সাক্ষাৎ, একসঙ্গে চলাফেরা ও নির্জনে সময় কাটানো ইত্যাদিকে বৈধ মনে করে। অথচ নিয়মতান্ত্রিক বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার আগে এসবের কোনোটিই বৈধ নয়। তাই সার্বিক দিক বিবেচনায় ইসলামি শরিয়ত ও সরকারি আইন অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পরেই শুধু কাবিননামার ফরম পূরণ করতে হবে, বিয়ের আগে নয়। কখনও যদি বিয়ের আগে ফরম পূরণ করে ফেলা হয়, তবে বরের স্বাক্ষর যেন বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পরেই নেওয়া হয়। আর যদি বরের স্বাক্ষরও বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার আগেই নিয়ে নেওয়া হয়, তবে বিয়ের পর অন্তত ১৮নং ধারা সম্পর্কে বরকে অবগত করে তার অনুমোদন ও পুনঃস্বাক্ষর নেওয়া জরুরি।

কাবিননামা,প্রচলিত ভুল
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত