
মোমিন বিজয়ী হলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে আর পরাজিত হলে ধৈর্য ধারণ করে। সে সর্বাবস্থায় সংঘাত ও সংঘর্ষ পরিহার করে, বরং মুমিন যখন বিজয়ী হয় তখন সে আরো বেশি দায়িত্বশীল হয়। দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে সে প্রতিপক্ষের প্রতি উদার আচরণ করে।
মহানবী (সা.)-এর জীবনে সবচেয়ে বড় বিজয় ছিল মক্কা বিজয়। আর মক্কা বিজয়ের সময় তিনি এমন একদল মানুষকে পরাজিত করেছিলেন, যারা তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। এমন কোনো নির্যাতন নেই, যা মক্কাবাসী নবীজি (সা.) ও তার সাহাবিদের প্রতি করেনি। এমনকি তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল।
মক্কা বিজয়ের দিন তিনি প্রতিশোধের সুযোগ পেয়েও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ তোমাদের প্রতি কোনো ভৎর্সনা নেই।’
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে প্রকৃত বিজয় প্রতিপক্ষকে দমন নয়, বরং উদারতার মাধ্যমে হৃদয় জয় করা। কোরআনেও একই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কোরআনে আছে, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা হা-মিমণ্ডসাজদা : ৩৪)।
প্রকৃত পক্ষে বিজয় মোমিনের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। বিজয়ের সময় সংযম ও নম্রতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মোমিনের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। মুমিনের চরিত্র সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর রহমানের বান্দারা তারা, যারা জমিনে নম্রভাবে চলাফেরা করে। যখন তাদের অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, সালাম।’ (সুরা ফোরকান : ৬৩)।
সুতরাং মুমিন জয় ও পরাজয় সর্বাবস্থায় নির্বিবাদ থাকতে পছন্দ করে। একজন প্রকৃত মোমিন বিজয় লাভ করার পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয় এবং আল্লাহর বান্দাদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করে। কেননা বিশ্বাস করে এই বিজয় মহান আল্লাহর দান। আর সে জানে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা নাহল : ২৩)।
যারা পরাজিত তাদেরও উচিত পরাজয়ের গ্লানি ভুলে বিজয়ীকে নেক কাজে সহযোগিতা করা। দল জয়ী হোক বা পরাজিত হোক, নিজ দলের কেউ অন্যায় কাজে লিপ্ত হলে তা থেকে বিরত রাখা মুমিনের দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ন্যায় ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো। তোমরা পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে একে অন্যের সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা মায়িদা : ২)।
মনে রাখতে হবে, মানব সমাজে মতবিরোধ অস্বাভাবিক নয়। এটা আল্লাহর সৃষ্টি বৈচিত্রেরই অংশ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদের এক জাতি করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তদ্দ¡ারা তোমাদের পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং সৎকর্মে তোমরা প্রতিযোগিতা কোরো। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তন।’ (সুরা মায়িদা : ৪৮)।
ইসলামের মহান শিক্ষা হলো মুসলমান ভাই ভাই। এক মুসলমান অন্যের জন্য ভাইয়ের মতো। আর ভ্রাতৃসংঘাত মুসলিম সমাজের জন্য আত্মঘাতী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আর আমি আমার মহান প্রতিপালকের কাছে আমার উম্মতের জন্য এই কথার আবেদন করেছি যে তিনি তাদের সবাইকে যেন দুর্ভিক্ষে ধ্বংস না করেন এবং তাদের নিজেদের ছাড়া কোনো শত্রু যেন তাদের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে, যারা তাদের ধ্বংস করে দেবে। নিশ্চয়ই আমার রব আমাকে বলেছেন, হে মুহাম্মদ! আমি যা ফয়সালা করি, তা বাতিল হয় না। তবে আমি তাদের সবাইকে একসঙ্গে দুর্ভিক্ষে ধ্বংস করব না এবং তাদের নিজেদের ছাড়া দিগি¦দিক হতে আগত তাদের সমূলে বিনাশকারী বিধর্মী শত্রুকে তাদের ওপর কর্তৃত্ব করতে দেব না, তবে তাদের কতক অপরদের ধ্বংস করবে এবং কতক অপরাধে বন্দি করবে।’ (আবু দাউদ : ৪২৫২)।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অনেক সময় নির্বাচনোত্তর সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয় না। এমন সংঘাত যদি সমাজে ছড়িয়েও পড়ে, তবে মুমিনের দায়িত্ব হলো যথাসম্ভব মানুষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা; এমনকি নিজে আক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকলেও। সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার কি মত যদি কেউ আমার ঘরে ঢুকে পড়ে এবং আমাকে হত্যা করার জন্য তার হাত প্রসারিত করে? তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি তখন আদম (আ.)-এর পুত্রের মতো (হাবিলের) হয়ে যাও। অর্থাৎ ক্ষতির ভয়ে পাল্টা আঘাত কোরো না। (আবু দাউদ : ৪২৫৭)।
যে কোনো বিপ্লব ও ক্ষমতার পালাবদলের পর সমাজে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি দেখা যায়। এমন সময় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো কঠোরভাবে তা রোধ করা, তা উসকে দেওয়া নয়; এমনকি বিশৃঙ্খলাকারী নিজ দলের লোক হলেও নয়। আরফাজা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের এক নেতার অধীনে একতাবদ্ধ থাকা অবস্থায় যে ব্যক্তি এসে তোমাদের শক্তি খর্ব করার চেষ্টা করবে অথবা তোমাদের ঐক্য বিনষ্ট করবে তাকে তোমরা হত্যা করবে।’ (মুসলিম : ৪৬৯২)।
সহিহ বুখারিতে এসেছে, এক যুদ্ধের সময় মদিনার সাহাবিদের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে মুনাফিক সর্দার উবাই ইবনুল সালুল বলে, ‘আল্লাহর কসম! আমরা মদিনায় ফিরলে সেখান থেকে প্রবল লোকেরা দুর্বল লোকদের বের করে দেবেই।’ তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাকে অনুমতি দিন। আমি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই।’ নবী (সা.) বললেন, ‘উমর! তাকে ছেড়ে দাও, যাতে লোকেরা এমন কথা বলতে না পারে যে মুহাম্মদ! তার সাথিদের হত্যা করছেন।’ (বোখারি : ৪৯০৭)।
নির্বাচনোত্তর সংঘাত নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তারা সংঘাত উসকে দেয় এমন কাজ তো করবেই না, বরং তারা নিজ নিজ অনুসারীদের সংযত রাখার চেষ্টা করবে। কোথাও সংঘাত দেখা দিলে নিরসনের চেষ্টা করবে। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের দুই দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে।’ (সুরা হুজুরাত : ৯)।
বিজয়ের পর বিজয়ী দল সুশাসনকে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করবে। কেননা সুশাসনই বিজয়ীদের প্রধান কাজ। খলিফা ওমর ইবনুল আবদুল আজিজ (রহ.)-এর প্রতি হাসান বসরি (রহ.)-এর ঐতিহাসিক অসিয়ত থেকে সুশাসনের সুফল ও আদর্শ শাসকের গুণাবলি জানা যায়। তিনি বলেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি জেনে রাখুন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ শাসককে সব ভারসাম্যহীন বস্তুর জন্য ভারসাম্য, পাপীর জন্য পরিশুদ্ধি, বিশৃঙ্খলার জন্য শৃঙ্খলা, দুর্বলের জন্য শক্তি, মজলুমের জন্য মুক্তি এবং অত্যাচারীর জন্য ভীতিস্বরূপ বানিয়েছেন।’ (সিরাতু ওমর ইবনুল আবদিল আজিজ, পৃষ্ঠা : ৯৩)।