
রোজা ফারসি শব্দ। এর আরবি শব্দ সাওম বা সিয়াম। অর্থ কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা। সুবহে সাদিক (রাতের শেষ দিকে পূর্ব দিগন্তের উভয় দিকে ক্ষীণ (দিগন্তের সঙ্গে ভার্টিক্যালি) প্রশস্ত আকারে যে আলো প্রকাশ পায়) থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার ও যাবতীয় যৌনাচারসহ অশ্লীলতা, অপচয়-অপব্যবহার, অন্যায় আচরণ ও অত্যাচার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের ওপর রোজা ফরজ। এটি ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি।
প্রথম কখন ও কোন রোজা ফরজ ছিল- এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, ১০ মহররম বা আশুরার রোজাই সর্বপ্রথম ফরজ ছিল। আবার কারও কারও মতে, আইয়ামে বিজ অর্থাৎ প্রত্যেক চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা ফরজ ছিল। রোজা রাখার বিধান সব যুগেই ছিল। আদম (আ.) থেকে শুরু করে মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবী-রাসুলের যুগেই রোজার বিধান ছিল।
ইতিহাসে প্রথম রোজা : রোজার সূচনা কবে থেকে হলো, সে বিষয়ে ধর্মীয় ইতিহাসের বাইরে খুব একটা জানা যায় না। আল্লাহতাআলা আদম (আ.)-এর ওপর রোজার বিধান আরোপ করে মানব ইতিহাসে প্রথম রোজার প্রচলন শুরু করেন। কোরআনে আছে, ‘হে ইমানদাররা, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা খোদাভীরু হতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসি (রহ.) বলেন, এখানে আদম (আ.) থেকে শুরু করে ইসা (আ.) পর্যন্ত সব নবী-রাসুলের যুগ বোঝানো হয়েছে। কোরআন ও হাদিস গবেষণা করলে রোজার ইতিহাস সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, আল্লাহ তাআলা আদম (আ.) জান্নাতে প্রেরণ করে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিশেষ এক ধরনের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন।
মুফাসসিরে কেরাম বলেন, এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা। আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে ওই গাছের ফল ভক্ষণ করেছিলেন এবং এর পরিণামে মহান আল্লাহ তাআলা তাদের ভূপৃষ্ঠে পাঠিয়ে দিলেন। পরে তারা ওই ভুলের জন্য যারপরনাই অনুতপ্ত হন, তওবা-ইসতেগফার করেন। এর কাফ্ফারাস্বরূপ ধারাবাহিক ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন।
অন্যান্য নবীদের সময়ে রোজা : আদম (আ.)-এর পর অন্য সব নবী-রাসুলের সময়ে রোজার বিধান ছিল। তবে তাদের রোজা পালনের পদ্ধতি ভিন্নতর ছিল। নুহ (আ.)-এর ওপরও রোজা ফরজ ছিল; রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নুহ (আ.) ১ শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন।’ (ইবনে মাজাহ : ৪১৪)।
মুসা (আ.)-এর ওপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার আগে তিনি ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তার ওপর ওহি বা প্রত্যাদেশ নাজিল করে আরও ১০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। ইদরিস (আ.) বছরজুড়ে প্রতিদিন রোজা রাখতেন। দাউদ (আ.) একদিন পর পর রোজা রাখতেন।
ইসলামে রোজা : মহানবী (সা.) মদিনায় আগমনের পর শুধু আশুরার রোজা রাখতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে দেখলেন, মদিনার ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখেন। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আজকে তোমরা কিসের রোজা রাখছো? উত্তরে তারা বলল, আজ সেই দিন যেদিন মহান আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তার জাতিকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফেরাউনকে সদলবলে নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ এ দিন মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এ দিন রোজা রাখি। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমরা তোমাদের থেকে মুসা (আ.)-এর অনুসরণের অধিক হকদার। এরপর তিনি আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।’ (মুসলিম : ১১৩০)।
১০ শাবান দ্বিতীয় হিজরিতে আল্লাহতাআলা রমজানের রোজা ফরজ করেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা পরহেজগারি (তাকওয়া) অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)।