ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রমজানের গুরুত্ব ও মোমিনের করণীয়

রমজানের গুরুত্ব ও মোমিনের করণীয়

ইসলাম একটি দৃঢ় ধর্ম। এটি কয়েকটি মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে; এর সঙ্গে আছে কিছু অবশ্য পালনীয় কাজ ও কিছু পছন্দনীয় মুস্তাহাব আমল। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো- সেইগুলো, যা তিনি তাঁর বান্দাদের ওপর ফরজ করেছেন। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় যে জিনিস দিয়ে নিকটবর্তী হয়, তা হলো আমি তার ওপর যা ফরজ করেছি।’ (বোখারি : ৬৫০২)। সবচেয়ে বড় ও আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ফরজ হলো ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ। এর মধ্যে কিছু আছে যা দিন-রাত সবসময় বান্দার সঙ্গে থাকে- যেমন কালেমায়ে শাহাদাত। কিছু কাজ দিনে-রাতে কয়েকবার করতে হয়। কিছু জীবনে একবার, আর কিছু প্রতি বছর পালন করতে হয়।

রমজানের রোজা প্রতি বছর ফিরে আসে। এর সময় কাছে এলে মহানবী (সা.) সাহাবিদের সুসংবাদ দিতেন, ‘তোমাদের কাছে এসেছে বরকতময় রমজান মাস। আল্লাহ তোমাদের ওপর এর রোজা ফরজ করেছেন। এ মাসে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয়, আর দুষ্ট শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। এতে এমন একটি রাত আছে যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে সত্যিই বঞ্চিত।’ (নাসায়ি : ২১০৬)।

রমজান এক সম্মানিত অতিথি, এর সময় খুব মূল্যবান। একে আনন্দ ও খুশির সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। রমজানকে ভালোভাবে গ্রহণ করার একটি উপায় হলো, এটি আসার আগেই ভালো কাজ শুরু করা; কারণ শুরু ভালো হলে পরের কাজও ভালো হয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) শাবান মাস থেকেই রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি নবী (সা.)-কে কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি, যতটা তিনি শাবান মাসে রাখতেন।’ (মুসলিম : ২৬১২)।

রমজান খুব অল্প দিনের অতিথি। ‘গণনাযোগ্য কয়েকটি দিন।’ তাই যাদের মনোবল বেশি, তারা এ মাসে আল্লাহর রহমত পাওয়ার চেষ্টা করবে ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। সর্বজগতের প্রতিপালকের একত্বে বিশ্বাসের মাধ্যমে ইবাদত সহজ হয় ও বান্দা ইবাদতের মাধুর্য অনুভব করে। মহান আল্লাহ হযরত মুসা (আ.)-কে বলেছেন, ‘আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। অতএব, আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর।’ (সুরা তহা : ১৪)। সব ভালো কাজের ভিত্তি হলো, আল্লাহর জন্য আন্তরিক নিয়ত। আল্লাহতায়ালা তাঁর নবীকে বলেছেন, ‘বল, আমি তো আদিষ্ট হয়েছি, আল্লাহর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর ইবাদত করতে।’ (সুরা জুমার : ১১)।

রোজার মাধ্যমে গোনাহ মাফ হওয়ার শর্ত হলো, আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার আশা রাখা। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ঈমানসহ পুণ্যের আশায় রমজানের সিয়াম ব্রত পালন করে, তার পূর্বের গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বোখারি : ৩৮)।

রমজানে রাতের নফল নামাজ ও তারাবিহ কবুল হওয়ার শর্তও একই যে, শুধু আল্লাহর কাছ থেকে সওয়াবের আশা করতে হবে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাতে নামাজ আদায় করে, তার আগের গোনাহ মাফ হয়ে যায়।’ (বোখারি : ৩৭)। নিয়ত সঠিক ও শক্ত হলে সওয়াব বহু গুণ বেড়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের ধনৈশ্বর্য আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি শস্যবীজ, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে একশত শস্যদানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা : ২৬১)। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘এটি মানুষের আমলের আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করে।’

আল্লাহ রোজার বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, এটিকে নিজের সঙ্গে সম্পর্কিত করে এর প্রতিদান নিজেই দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। যখন দানকারী স্বয়ং আল্লাহ, তখন পুরস্কারের পরিমাণ কেমন হবে তা কল্পনাও করা যায় না। মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আদম সন্তানের সব আমল তার নিজের জন্য; কিন্তু রোজা আমার জন্য; আর আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (বোখারি : ৫৯২৭)। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, এখানে সেই রোজার কথা বলা হয়েছে, যা কথা ও কাজে গোনাহ থেকে মুক্ত থাকে।

রমজান হলো মাসগুলোর নেতা। এই মাস হলো, পরিশ্রম, ধৈর্য ও ইবাদতের মাস। এই মাসেই মহান কোরআন নাজিল হয়েছে, এর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রাতে। জিবরাইল (আ.) এ মাসে নবী করিম (সা.)-এর সঙ্গে কোরআন পর্যালোচনা করতেন। পূর্ববর্তী নেককার লোকেরা যখন রমজান মাস পেতেন, তখন তারা হাদিস ও ফিকহের আলোচনা কমিয়ে বেশি করে কোরআন তিলাওয়াতে মন দিতেন। কাতাদা (রহ.) রমজানে প্রতি তিন দিনে একবার কোরআন খতম করতেন, আর শেষ দশক এলে প্রতিরাতে খতম করতেন। তাই তোমরা এই মাসে দিন-রাত বেশি করে তোমাদের প্রতিপালকের কিতাব তিলাওয়াত করো; এতে হৃদয় প্রশান্ত হয়।

ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ। আর রমজানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে রাতের নামাজ আদায় করে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে নামাজ পড়ে শেষ পর্যন্ত থাকে, তার জন্য পুরো রাত ইবাদতের সওয়াব লেখা হয়।’ (তিরমিজি : ৮০৬)। মানুষ এক মুহূর্তও আল্লাহ ছাড়া চলতে পারে না। রোজাদারের দোয়া কবুল হয়; তাই আল্লাহর কাছে যা চাওয়ার চাও—তিনি দয়ালু ও দানশীল। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘পৃথিবীর কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে দোয়া করলে আল্লাহ তা তাকে দেন, অথবা এর সমপরিমাণ কোনো বিপদ তার থেকে দূর করেন। যদি সে পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া না করে।’ একজন বললেন, ‘তাহলে আমরা বেশি বেশি দোয়া করব।’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ আরও বেশি দেবেন।’ (তিরমিজি : ৩৫৭৩)।

রমজান হলো দানশীলতা ও দুর্বলদের প্রতি দয়ার মাস। বিশ্বনবী (সা.) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন, আর রমজানে তিনি আরও বেশি দান করতেন- যখন জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। জিবরাইলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে আল্লাহর রাসুল (সা.) কল্যাণের কাজে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি উদার হয়ে যেতেন।’ (বোখারি)। প্রবাহিত বাতাস যেমন সবার উপকার করে, তেমনি দানের উপকারও সবার কাছে পৌঁছে। আর কেয়ামতের দিন সদকা দানকারীকে ছায়া দেবে। ইবনে ওমর (রা.) রমজানে এতিম ও গরিবদের সঙ্গে ছাড়া ইফতার করতেন না।

তওবার দরজা সবসময় খোলা। তওবা ছাড়া কেউ আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণভাবে ঘনিষ্ঠ হতে পারে না। আল্লাহ সব মুমিনকে তওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা সফল হয়, ‘হে মোমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সুরা নুর : ৩১)। আল্লাহ নিজেকে ‘তওবা কবুলকারী’ বলেছেন, যাতে বান্দারা তাঁর দিকে ফিরে আসে। যে তওবা করে তাঁর কাছে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন, আশ্রয় দেন, তার পাপকে নেকিতে বদলে দেন। মানুষের জীবনের সেরা দিন হলো, যেদিন আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।

ইস্তেগফার নেয়ামত আনে ও বিপদ দূর করে। শাইখুল ইসলাম (রহ.) বলেছেন, ‘বান্দা যখন বুঝতে পারে যে, তার বিপদ তার নিজের গোনাহের কারণে, তখন সে তওবা ও ইস্তেগফার করে। ফলে বিপদের কারণ দূর হয়ে যায়। তখন সে সবসময় কৃতজ্ঞ ও ক্ষমাপ্রার্থী থাকে। এভাবে তার কল্যাণ বাড়তে থাকে ও অকল্যাণ দূরে সরে যায়।’ রমজানে আল্লাহর জিকির রোজাদারের সৌন্দর্য। ইবনে কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘প্রতিটি ভালো কাজের মধ্যে যে বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে, সেই শ্রেষ্ঠ। তাই রোজাদারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো- সেই ব্যক্তি, যে রোজা অবস্থায় বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে।’ পাপ ও ময়লা থেকে হৃদয়কে পরিষ্কার রাখা রোজাদারের মর্যাদা বাড়ায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে শুধু সে, যে আল্লাহর কাছে আসবে বিশুদ্ধ অন্তকরণ নিয়ে।’ (সুরা শুআরা : ৮৮-৮৯)। ফুজাইল ইবনে আয়াজ (রহ.) বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ বেশি রোজা বা নামাজের কারণে উচ্চমর্যাদা পায়নি; বরং পেয়েছে উদার মন ও পরিষ্কার হৃদয়ের কারণে।’

রোজা শুধু খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকা নয়; বরং শরীরের অঙ্গগুলোকে পাপ থেকে বিরত রাখা। যেমন: গিবত, যা নেকি নষ্ট করে; বা হারাম দৃষ্টি, যা রোজার সওয়াব কমায়। রমজানে তোমার মধ্যে যেন মর্যাদা ও শান্তভাব থাকে, আর রোজার দিন ও অন্য সময় যেন একরকম না হয়। রমজানে কল্যাণের দরজাগুলো খোলা থাকে। এটি যেন এক প্রতিযোগিতার মাঠ- যেখানে যারা ইবাদতে এগিয়ে যায়, তারাই সফল হয়। সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে রমজানে বিভিন্ন ধরনের ইবাদত করে। নবী করিম (সা.) রমজানে এমন সব ইবাদত একত্র করতেন, যা অন্য সময় করতেন না। আর প্রতিদান কাজের ধরন অনুযায়ীই দেওয়া হয়। আল্লামা ইবনে কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘যার দুনিয়ায় আল্লাহর প্রিয় বিভিন্ন ভালো কাজ থাকে, জান্নাতে সে বিভিন্ন নেয়ামতের স্বাদ পাবে। এখানে যত বেশি ও বৈচিত্র্যময় আমল করবে, সেখানে তত বেশি আনন্দ ও পুরস্কার পাবে।’ অলসতা ও উদাসীনতা থেকে সাবধান! রমজান মাত্র কয়েকটি দিন, যা দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। তাই ধন্য সে ব্যক্তি, যে রমজান পায়; আরও সুখবর তার জন্য, যে রোজা রাখে, রাতের ইবাদত করে ও বেশি বেশি নেক কাজ করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মোমিনগণ, তোমাদের জন্যে সিয়ামের বিধান দেওয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)।

দিন-রাত আমাদের জীবনের সময় কমে যাওয়ার ও বিদায় কাছাকাছি চলে আসার খবর দেয়। বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে শিক্ষা নেয় ও আমল করে। স্মরণ করুন, অনেকেই একসময় আমাদের সঙ্গে রোজা রেখেছিল, কিন্তু আজ তারা কবরে তাদের কাজের ফল ভোগ করছে; তারা হয়তো রমজানের একটি রোজা রাখার সুযোগ কামনা করছে। আল্লাহ আমাদের এখনও সময় দিয়েছেন। আসুন, এ সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই কাজে লাগাই। কারণ অনেকেই একটি দিন পায়, কিন্তু তা পূর্ণ করতে পারে না; আবার অনেকেই আগামীকালের আশা করে; কিন্তু তা আর পায় না।

(২৫-০৮-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ১৩-০২-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)

রমজান,গুরুত্ব,মোমিন
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত