ঢাকা শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

নির্বাচনি সহিংসতায় জানুয়ারিতে ৪ জনের মৃত্যু, আহত ৫০৯

নির্বাচনি সহিংসতায় জানুয়ারিতে ৪ জনের মৃত্যু, আহত ৫০৯

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের খবরের মধ্যে জানুয়ারি মাসে মোট ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতার তথ্য দিয়েছে বেসরকারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।

এসব সহিংসতায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে ৫০৯ জন। আর ডিসেম্বর মাসে সারাদেশে সাতটি সহিংসতায় একজনের প্রাণহানির পাশাপাশি ২৭ জন আহত হয়েছিলেন।

জানুয়ারি মাসের শেষ দিনে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এমএসএফ এর মাসিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনি সহিংসতা ছিল এ মাসের অন্যতম ‘সবচেয়ে ভয়াবহ’ মানবাধিকার সংকট।

এর বাইরে চলতি মাসে ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ২১৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুষ্কৃতিকারীর হামলায় মারা গেছেন ছয়জন। আগের মাসে ১৬টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২৪ জন আহত হয়েছিলেন। ওই মাসে দৃস্কৃতিকারীর হামলায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৪ জনে।

তুলনামূলক বিশ্লেষণে এমএসএফ বলছে, এটি প্রমাণ করে যে, জানুয়ারি মাসে নির্বাচনি প্রক্রিয়া কার্যত প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে যাচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার এরশাদ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম নির্বাচনি সহিংসতায় নিহত হয়েছেন।

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এছাড়া কিশোরগঞ্জ-২ আসনের কটিয়াদি উপজেলার আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিন ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চনে আজাহর নামে এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি সহিংসতার ৬৪টি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৩টি ঘটনা বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের। এছাড়া বিএনপির অন্তর্দ্বন্দে ১৩টি, বিএনপি-স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের ৯টি সংঘর্ষ, গণঅধিকার পরিষদ-স্বতন্ত্রের একটি এবং বিএনপি-এনসিপির মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে।

আর ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় বিএনপির অন্তর্দ্বন্দে ১৬টি, বিএনপি-আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের দুটি এবং বিএনপি-জামায়াতের পাঁচটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন, যাদের সকলেই বিএনপির কর্মী ও সমর্থক।

এছাড়া অপমৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরো ১০ জন; যাদের মধ্যে ৪ জন বিএনপির, ২ জন জামায়াতের, ২ জন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের, ১ জন কিশোর এবং ১ জন বৃদ্ধা রাজনৈতিক রোষানলে পুড়ে মারা গেছেন।

এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে কারা হেফাজতে মোট ১৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, গত মাসে এ সংখ্যা ছিল ৯ জনে। জানুয়ারিতে মৃত্যুর মধ্যে ৪ জন কয়েদি ও ১১ জন হাজতি রয়েছেন। ১১ জন মৃত হাজতি বন্দির মধ্যে ৫ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।

কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২ জন, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ জন এবং জামালপুর জেলা কারাগারে ১ জন কয়েদি মারা যান।

এছাড়া হাজতির মধ্যে কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২ জন, নরসিংদী জেলা কারাগারে, লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে, নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে, পাবনা জেলা কারাগারে, পটুয়াখালী জেলা কারাগারে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে, মেহেরপুর জেলা কারাগারে, নওগাঁ জেলা কারাগারে ও রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন করে বন্দি মারা গেছেন। তবে সব বন্দির মৃত্যু হয়েছে কারাগারের বাইরে হাসপাতালে।

মেহেরপুর কারাগারে নয়ন নামের এক কয়েদিতে চোখ বেঁধে দফায় দফায় মারধরের অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বরত কারারক্ষী মিশু, হযরত ও হাবিব নামের তিনজনের বিরুদ্ধে।

এমএসএফ বলছে, কারাগারে বন্দিদের শারীরিক নির্যাতনের আইনি কোনো বৈধতা না থাকলেও নয়নকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে—এমন অভিযোগ করেছেন সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একাধিক বন্দি।

জানুয়ারিতে ২৯টি ‘গণপিটুনির’ ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে এমএসএফ বলছে, এসব ঘটনায় আহত ২১ জন মারা গেছেন; গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন ২৬ জন। গণপিটুনির শিকার ১৭ জনকে আহতাবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়।

নিহতদের মধ্যে একজন ছিনতাইয়ের অভিযোগে, ১০ জন চুরির অভিযোগে, দুজন খুনের অভিযোগে, একজনকে ডাকাতি, একজনকে পরকীয়া, চারজনকে বাকবিতণ্ডা, একজনকে মাদক ব্যবসা এবং একজনকে চাঁদাবাজির অভিযোগে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে আটজনকে ডাকাতির অভিযোগে, তিনজনকে চুরির অভিযোগে, দুজনকে পরকীয়া, একজনকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে, তিনজনকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী হওয়ার অভিযোগে এবং কটূক্তি, প্রতারণা, প্রেম এ ধরনের অপরাধজনিত কারণে ৯ জনকে ‘গণপিটুনি’ দিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।

এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৯ জন নারী, ৪৮ জন পুরুষসহ মোট ৫৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে- যাদের পরিচয় অজানা।

আগের মাসে অচেনা পরিচয়ের ৪৮টি লাশ উদ্ধার করা হয় জানিয়ে এমএসএফ বলছে, অল্প কিছু ঘটনা ছাড়া সব কয়টি লাশের পরিচয় অজানাই থেকে যাচ্ছে। এসব লাশের বেশির ভাগই নদী বা ডোবায় ভাসমান, মহাসড়ক বা সড়কের পাশে, সেতুর নিচে, রেল লাইনের পাশে, ফসলি জমিতে ও পরিত্যক্ত স্থানে পাওয়া যায়।

এমএসএফ আরো জানিয়েছে, গেল ৯ জানুয়ারি কোস্ট গার্ডের অভিযানকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া জানুয়ারিতে পুলিশ ও সেনা হেফাজতে দুজনের মৃত্যুর ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দুটি মৃত্যুর ক্ষেত্রেই পরিবারের তরফে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে।

গেল ২২ জানুয়ারি রংপুর নগরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ধাপ চিকলী ভাটা এলাকার ট্রাকচালক মুকুল মিয়াকে কোতোয়ালী থানার এসআই মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের পুলিশ দল সাদা পোশাকে আটক করে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মোবাইল ফোনে পরিবারকে জানানো হয়, মুকুল মিয়া মারা গেছেন।

এর আগে ১২ জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গার জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলুকে সেনাবাহিনীর একটি দল তুলে নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এর বাইরে চলতি মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে দুজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে এমএসএফ। এর মধ্যে ২১ জানুয়ারি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আবুল বাশার নামের এক বিএনপি কর্মীকে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে থেকে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এরপর ২৯ জানুয়ারি সাতক্ষীরার আশাশুনিতে সেনাবাহিনীর মারধরে একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে এমএসএফ। সংস্থাটির বর্ণনা অনুযায়ী, সন্ধ্যায় একটি মোটরসাইকেলে করে হেলমেট ছাড়াই তিন বন্ধু কাকবাশিয়া বাজারে আসছিলেন। এ সময় সেনাবাহিনীর একটি টহল দল তাদের গতিরোধ করে এবং ইসমাইল হোসেনকে মারধর করে। ফলে ঘটনাস্থলেই ইসমাইলের মৃত্যু হয়।

সার্বিকভাবে এমএসএফ বলেছে, আগের মাসের তুলনায় জানুয়ারিতে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি গুণগত ও পরিমাণগত—উভয় দিক থেকেই ‘অবনতি’ ঘটেছে।

সহিংসতা,নির্বাচন,আহত
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত