অনলাইন সংস্করণ
১১:৫৪, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বিপুল ব্যবধানে গণভোটে জিতেছে ‘হ্যাঁ’ ভোট। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথ খুলল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গত বৃহস্পতিবার জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল শুক্রবার বেলা তিনটায় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখের কিছু বেশি।
সচিব আখতার আহমেদ জানান গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন।
‘হ্যাঁ’ জয়ে কী হবে : গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ার ফলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথ খুলল। এতে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে। সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। এ ছাড়া কোনো বিষয়ে সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে।
‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সংবিধান সংশোধন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসবে। কোনো একটি দলের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের অঙ্গীকার করে। এ লক্ষ্যে তারা ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। এরপর আরও কয়েকটি খাতে সংস্কারের সুপারিশ দিতে কমিশন করা হয়।
প্রথমে গঠন করা ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে ১৬৬টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমিশনের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ।
এসব প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধানসম্পর্কিত। অন্য প্রস্তাবগুলো সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ জারি বা আইন বিধি করে বাস্তবায়ন সম্ভব। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের কিছু প্রস্তাব ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
কিন্তু সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ বা কোনো আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধানসম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টিকে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে চিহ্নিত করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
মূলত সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে আদেশ জারি। গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন রাষ্ট্রপতি।
বাস্তবায়নের দ্বিতীয় স্তরে হয়েছে গণভোট। এই গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কারসম্পর্কিত অংশ নিয়ে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন তৃতীয় স্তর শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে। তবে পরিষদ নির্দিষ্ট সময়ে সংবিধান সংস্কার না করলে কী হবে, তা বাস্তবায়ন আদেশে উল্লেখ নেই।
কেমন হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট : সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকবেন না, এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল।
এখন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতিকে কাজ করতে হয়। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।
জুলাই সনদে আইনসভা বা সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন করতে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন লাগবে।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের হার ৫৯.৪৪ শতাংশ: জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছে ইসি। ইসির জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক গতকাল শুক্রবার সকালে এই তথ্য জানান। এর আগে বৃহস্পতিবার ভোটের সাড়ে ছয় ঘণ্টায় ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৬ হাজার ৩১ কেন্দ্রে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য জানিয়েছিল ইসি। এদিন সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত টানা ৯ ঘণ্টা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এর আগের ১২টি সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর আয়োজিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। আর সবচেয়ে কম ভোট পড়েছিল ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।এই দুই নির্বাচনে ভোট পড়েছিল যথাক্রমে ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ৪৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে আরোপিত বিধিনিষেধের অংশ হিসেবে শুক্রবার সারাদেশে মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।তবে মোটরসাইকেল ছাড়া অন্যান্য সব ধরনের যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটিএ সংস্থাপন শাখার উপসচিব আল-আমিন মো. নুরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ উপলক্ষে ১১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত (২৪ ঘণ্টা) ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিলো।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত, ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে পরিবর্তনের পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত এ গণভোটে মোট প্রদত্ত ভোটের হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে এক ব্রিফিংয়ে এ ফলাফল ঘোষণা করেন ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
ফলাফল বিস্তারিত তুলে ধরে ইসি সচিব জানান, গণভোটে পরিবর্তনের পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ভোটার। অন্যদিকে, বিপক্ষে অর্থাৎ ‘না’ ভোট দিয়েছেন দু’ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন।
সংসদ নির্বাচনের তুলনায় গণভোটে ভোটের হার কিছুটা বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, কিন্তু গণভোটে তা ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর কারণ হলো, আদালতের নির্দেশনায় চট্টগ্রামের দু’টি সংসদীয় আসনের (চট্টগ্রাম ২ ও ৪) ফলাফল স্থগিত থাকলেও সেখানে গণভোটের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। ফলে ওই দু’ আসনের ভোটও গণভোটের সার্বিক ফলাফলে যুক্ত হয়েছে।’
গেজেট প্রকাশ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল আলাদাভাবে নয়, বরং একটি সমন্বিত গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে চূড়ান্ত ফলাফলের হার্ডকপি পাওয়ার পর তা যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।