ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

শেরপুরে সহিংসতার ঘটনা নিয়ে জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন

শেরপুরে সহিংসতার ঘটনা নিয়ে জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন

শেরপুরে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ করা হয় এবং ঘটনার সূত্রপাতসহ বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

তিনি বলেন, বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের উসকানি ও সরাসরি নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

তিনি দাবি করেন, সেখানে বিএনপির সন্ত্রাসীরা আগে থেকেই জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলকে হত্যার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিল।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত ইউএনও ও পুলিশ প্রশাসন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে নীরবতা পালন করেছে। এতে প্রমাণিত হয় প্রশাসন একদিকে হেলে পড়েছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না এবং নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বিএনপির সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

লিখিত বক্তব্যে শেরপুরের ঘটনার সূত্রপাত ও বিবরণ তুলে ধরে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বুধবার (২৮ জানুয়ারি) শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশকে ম্লান করে দিয়েছে। ওই দিন উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ঝিনাইগাতি ও শ্রীবরদী উপজেলা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি আসনের প্রার্থীদের নিয়ে ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

তিনি জানান, ওই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিএনপির একদল উগ্র ও উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীর অব্যাহত উসকানির কারণে ১১ দলীয় জোট ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে কুপিয়ে হত্যা করে বিএনপির একদল সন্ত্রাসী ও গুন্ডাবাহিনী।

ঘটনার সূত্রপাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঝিনাইগাতি ও শ্রীবরদী উপজেলা মিলিয়ে শেরপুর-৩ আসন। বুধবার দুপুর আড়াইটায় ঝিনাইগাতি স্টেডিয়াম মাঠে শেরপুর-৩ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার উদ্যোগে সব প্রার্থীর ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠান ছিল। যথাসময়ে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল নেতাকর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়ে আসন গ্রহণ করেন। পরে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল ও তার সমর্থকরা অনেক বিলম্বে সেখানে পৌঁছান।

ওই সময় বিএনপির নেতারা ইউএনওকে অর্ধেক অর্ধেক আসন ভাগ করে দিতে বলেন। পরে ইউএনও জামায়াত প্রার্থীকে কিছু চেয়ার ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। নুরুজ্জামান বাদল মাইকে কর্মীদের আসন ছাড়তে বলেন। জামায়াতের কর্মীরা চেয়ার ছেড়ে দেয়ার পরও বিএনপির উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা বাকবিতণ্ডা শুরু করে। একই সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল, বিএনপি নেতা আব্দুর হান্নানসহ অন্য নেতাকর্মীরা অব্যাহত উসকানি দিতে থাকে। এতে হাতাহাতি ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এই সময় পুলিশ প্রশাসন বিএনপির নেতাকর্মীদের নিবৃত্ত না করে নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করে বলে অভিযোগ করা হয়।

সংঘর্ষের একপর্যায়ে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল ও তার নেতাকর্মীরা স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে ঝিনাইগাতি বাজারে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে মাঠে অবস্থান করে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও সমর্থকরা। এ সময় বিএনপি সমর্থক ফাহমী গোলন্দাজ সোহেল ফেসবুকে ‘জামায়াতের বাদলকে পেলে জবাই করা হবে’ ধরনের উসকানিমূলক স্ট্যাটাস দেন বলে দাবি করা হয়।

এরপর ঝিনাইগাতি বাজারে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় বিএনপির নেতাকর্মীরা এবং জামায়াত ও ১১ দলীয় প্রার্থীকে স্টেডিয়াম থেকে বের হতে না দেয়ার ঘোষণা দেয়। পুলিশ প্রশাসন রাস্তা ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ জানালে তারা তাতে অস্বীকৃতি জানায়। একই সঙ্গে মাইকে বিএনপি নেতাকর্মীরা উসকানি দিতে থাকলে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

পরবর্তীতে প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা না পেয়ে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল নেতাকর্মীদের নিয়ে বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। প্রতিরোধ করতে গেলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এতে জামায়াত নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকের রাস্তা ও স্টেডিয়ামের দিকে চলে যান। ওই সময় জামায়াতের শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম পেছনে পড়ে যান। তাকে একা পেয়ে কুপিয়ে আহত করে রেখে যায় বিএনপির কর্মীরা। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান।

অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, এই সংঘর্ষে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৬ জনকে শেরপুর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে এবং গুরুতর আহত তিনজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, পুরো ঘটনার মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রথম দফায় পুলিশ সহযোগিতা করলে পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না।

তিনি জানান, সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে এসে সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা করেছে। এজন্য তারা সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে সংঘর্ষের সময় সেনাবাহিনীর এক সদস্য আহত হওয়ায় তার প্রতি সমবেদনা জানান এবং দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, শেরপুর-৩ আসনে ঘটে যাওয়া এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা পুলিশসহ গোটা প্রশাসনের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জামায়াত অবিলম্বে শহিদ রেজাউল করিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে ঝিনাইগাতি উপজেলা প্রশাসনের ব্যর্থতা তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার দাবিও জানানো হয়।

এছাড়া গত কয়েকদিনে সারাদেশে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা দেয়া হয়েছে এবং নারী কর্মীদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের অভিযোগ করা হয়। প্রশাসনকে বারবার জানানো হলেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে দাবি করে দলটি। প্রশাসনের এই ধরনের একপাক্ষিক আচরণের প্রতিবাদও জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, এলডিপির সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নূরে আলম ও যুব বিষয়ক সম্পাদক আমান সুবহান, খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক আবদুল আজিজ খসরু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক এইচ এম জিয়াউল আনোয়ার ও গণসংযোগ ও মিডিয়া বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবলু, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির দপ্তর সম্পাদক শহিদুল আলম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জামায়াত নেতা জাহিদুর রহমান এবং সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন,শেরপুরে সহিংসতা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত