
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ, রাষ্ট্র সংস্কার, সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামগ্রিক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও গবেষণা-উদ্যোগ ‘সেন্টার ফর সোসাইটি অ্যান্ড কালচার’ (সিএসসি) বা সমাজ-সংস্কৃতি কেন্দ্রের আত্মপ্রকাশ হয়েছে।
গত ৮ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার উডব্রিজে ‘36 July: Ignited in Resilience, United for the Future’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সিএসসির প্রথম প্রকাশ্য আত্মপ্রকাশ ঘটে। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ এবং রাষ্ট্র সংস্কারে প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সিএসসির পাশাপাশি জুলাই হাউস, ব্যান্ড (BAND), সেভ বাংলাদেশ (SAVE Bangladesh), সোচ্চার ও দ্য বেঙ্গল কাউন্সিলের যৌথ সহযোগিতায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত প্রবাসী নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানটি দুটি পর্বে বিভক্ত ছিল। প্রথম পর্বে ছিল বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আলোচনা এবং দ্বিতীয় পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্রথম পর্বের আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, ‘জুলাই রেকর্ডস’-এর চেয়ারম্যান কাজী ওয়ালি উল্লাহ, অভ্যুত্থানের শহীদ রাব্বির বোন মিম আক্তার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়ব এবং দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ অনেকে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাংলাদেশপন্থী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জরুরি প্রয়োজনের ওপর জোর দেন।
‘জুলাই রেকর্ডস’-এর চেয়ারম্যান কাজী ওয়ালি উল্লাহ আন্দোলনের মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। অভ্যুত্থানের শহীদ রাব্বির বোন মিম আক্তার ভাইয়ের মরদেহ বহন করার আবেগঘন স্মৃতিচারণ করে হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত নৃশংসতার দ্রুত ন্যায়বিচারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
‘ডেইলি ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম অভ্যুত্থানের সময় সাংবাদিকদের জীবনঝুঁকি এবং তৎকালীন প্রধান সারির গণমাধ্যমগুলোর সত্য চেপে যাওয়ার চেষ্টার বিপরীতে সংবাদ প্রকাশের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়ব প্রবাসী বাংলাদেশিদের মেধা ও দক্ষতাকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের যাত্রায় তাঁর অবিচল সমর্থন ব্যক্ত করেন। ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় প্রবাসী আন্দোলন সংগঠনে অসামান্য নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীকে শহীদদের নাম খচিত একটি বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রদূতের পক্ষে তাঁর স্ত্রী তামান্না তাহসিন এ পুরস্কার গ্রহণ করেন।
এছাড়া ড. নুসরত রহমান, মুনিবা ফখরুল ও শাফকাত রাব্বির অংশগ্রহণে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জনমত গঠন এবং দাবি আদায়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বক্তব্য দেন সিএসসির বোর্ড ডিরেক্টর মুনা হাফসা ও প্রধান সদস্য রেদওয়ান হোসেন তালুকদার। তারা বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক উদ্যোগের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
ঢাকার বাইরে সমগ্র বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায় এবং প্রবাসীদের মধ্যে এই সাংস্কৃতিক জাগরণ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি জুলাইয়ের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে সিএসসির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তারা।
দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক জাগরণ ও সংগীতের মাধ্যমে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়। শিক্ষার্থী-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিকে ধারণ করে অনুষ্ঠানে একটি উদ্দীপনাময় সাংস্কৃতিক পর্ব পরিবেশিত হয়।
কনসার্টের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন প্রখ্যাত রক আইকন জন কবির। তাঁর গানের সঙ্গে পুরো মিলনায়তন একযোগে গেয়ে ওঠে। ওহাইওভিত্তিক ব্যান্ড ‘কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড রক’ (সিএফআর)-এর পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। এতে সিএসসি সদস্য শেখ আহমেদ সাকিব কিবোর্ড ও ভোকালিস্ট হিসেবে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে জড়িত জনপ্রিয় গান—‘মুক্তির মন্দির’, ‘৩৬ জুলাই’, জেমসের ‘বাংলাদেশ’ এবং কাকতালের ‘ওই মা তোর পোলা মরে নাই’ পরিবেশিত হয়। এছাড়া শহীদদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে কবিতা আবৃত্তি ও একটি সংক্ষিপ্ত নাটক মঞ্চস্থ হয়।
মূল অনুষ্ঠানের বাইরে মিলনায়তন প্রাঙ্গণে গণঅভ্যুত্থানের প্রদর্শনী ও মেলার আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি আনা জুলাই আন্দোলনবিষয়ক বইয়ের বিশেষ সংগ্রহ প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয়।
এছাড়া শিল্পী দেবাশীষ চক্রবর্তীর অনুমতি নিয়ে তাঁর আঁকা জুলাই আন্দোলনের নির্বাচিত কিছু পোস্টার পুনর্মুদ্রণ করে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। এতে দর্শকদের মাঝে অভ্যুত্থানের দৃশ্যমান স্মৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।