ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ঘড়ি যখন ব্যক্তিত্বের পরিচয়

মোবাইল ফোন যখন মুহূর্তেই সময় জানিয়ে দিচ্ছে, তখনও কবজির ঘড়ি কেন এত জনপ্রিয়? কারণ ঘড়ি এখন শুধু সময় দেখার যন্ত্র নয়, এটি ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্বেরও পরিচায়ক। পুরুষের জন্য ক্ল্যাসিক, ফরমাল কিংবা স্পোর্টি ঘড়ি যেমন পোশাকে আভিজাত্য যোগ করে, তেমনি নারীদের ঘড়িতে থাকে সৌন্দর্য, নকশা ও রুচির বৈচিত্র্য। লিখেছেন— নাদিয়া আফরিন
ঘড়ি যখন ব্যক্তিত্বের পরিচয়

সময় দেখার জন্য এখন আর ঘড়ির ওপর নির্ভর করতে হয় না। পকেট কিংবা হাতে থাকা স্মার্টফোনেই মুহূর্তে জানা যায় সময়। তবু হাতঘড়ির জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে এর ব্যবহার ও গুরুত্ব। একসময় ঘড়ি ছিল প্রয়োজনীয় একটি যন্ত্র, এখন এটি ফ্যাশন, রুচি, ব্যক্তিত্ব ও কখনো কখনো সামাজিক অবস্থানেরও প্রতীক।

ফ্যাশনসচেতন মানুষের পোশাকে বা জুতা, চশমা, ব্যাগ কিংবা গয়নায় যেমন বিশেষ গুরুত্ব পায়, তেমনি কবজির ঘড়িও হয়ে উঠেছে সাজের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। পোশাকের ধরন ও অনুষ্ঠানের সঙ্গে মিলিয়ে ঘড়ি বেছে নেওয়ার প্রবণতা এখন বেশ পরিচিত। অফিসের আনুষ্ঠানিক পোশাকের সঙ্গে এক ধরনের ঘড়ি, আবার ভ্রমণ কিংবা আড্ডায় আরেক ধরনের ঘড়ি— এভাবেই বদলে যায় পছন্দ।

মোবাইল থাকতেও ঘড়ি কেন : মোবাইল ফোন থাকার পরও মানুষ ঘড়ি পরেন কেন— প্রশ্নটি স্বাভাবিক। এর একটি উত্তর হলো, ঘড়ি সময় জানানোর পাশাপাশি ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে। সময় দেখার জন্য ফোন বের করতে হলে চোখ চলে যেতে পারে বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অন্য কোনো নোটিফিকেশনের দিকে। ঘড়ির ক্ষেত্রে সেই ঝামেলা নেই। কবজিতে একবার তাকালেই সময় জানা যায়।

এ ছাড়া অনেকের কাছে ঘড়ি পরা দীর্ঘদিনের অভ্যাস। কেউ ঘড়ি ছাড়া বাইরে বের হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কারও কাছে আবার এটি নিজের স্টাইলকে পূর্ণতা দেওয়ার উপায়। বিশেষ করে ব্যবসায়িক বৈঠক, চাকরির সাক্ষাৎকার, আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আয়োজনে একটি রুচিশীল ঘড়ি ব্যক্তিকে আরও পরিপাটি ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। তবে সময় দেখার সুবিধার সঙ্গে ফ্যাশনের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি যুক্ত হয়েছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। ডিজিটাল ও স্মার্টওয়াচের জনপ্রিয়তা তারই প্রমাণ।

দামের পরিসর : ঘড়ির বাজারে দামের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। সাধারণ ব্যবহারের ঘড়ি পাওয়া যায় কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার টাকার মধ্যেই। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাঝারি দামের ঘড়িরও রয়েছে বড় ক্রেতাগোষ্ঠী। আবার ফ্যাশন ও ব্র্যান্ড সচেতন ক্রেতারা তুলনামূলক দামি ঘড়ির দিকে ঝোঁকেন। ঘড়ির দাম নির্ধারণে শুধু ব্র্যান্ড নয়, এর মেশিন, নির্মাণ উপাদান, নকশা, কারিগরি মান, স্থায়িত্ব ও প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্টেইনলেস স্টিলের পাশাপাশি টাইটানিয়াম, সিরামিক, সোনা কিংবা অন্যান্য মূল্যবান উপাদান ব্যবহারের কারণে অনেক ঘড়ির দাম বেড়ে যায়। সীমিত সংস্করণ বা বিশেষ নকশার ঘড়ির দামও সাধারণ মডেলের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

দামি ব্র্যান্ডের আলাদা কদর : বিশ্বের বিলাসবহুল ঘড়ির বাজারে কয়েকটি ব্র্যান্ডের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রোলেক্স, পাটেক ফিলিপ, অডেমার্স পিগে, রিচার্ড মিল, ভ্যাশেরন কনস্টান্টিন, কার্টিয়ার, ওমেগা, ব্রেগে, হুবলো, ব্রাইটলিং ও জ্যাগার-ল্যকুলত্র। এসব ব্র্যান্ডের ঘড়ি শুধু সময় দেখার জন্য নয়, আভিজাত্য ও রুচির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। বিশেষ করে রোলেক্স, পাটেক ফিলিপ, অডেমার্স পিগে ও রিচার্ড মিলের কিছু মডেলের দাম অত্যন্ত বেশি। নকশা, কারিগরি উৎকর্ষ, মূল্যবান ধাতুর ব্যবহার, সীমিত সংস্করণ এবং ব্র্যান্ডের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কারণে এসব ঘড়ির প্রতি সংগ্রাহক ও বিলাসী ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। অনেকের কাছে একটি দামি ঘড়ি ব্যক্তিগত অর্জন, সামাজিক অবস্থান কিংবা বিশেষ কোনো স্মৃতিরও প্রতীক হয়ে ওঠে।

ঘড়িতেই ব্যক্তিত্বের ছাপ : একজন মানুষের ঘড়ি নির্বাচন অনেক কিছুই বলে দিতে পারে। যিনি সাধারণ ও মার্জিত সাজ পছন্দ করেন, তিনি হয়তো বেছে নেবেন ছোট বা মাঝারি ডায়ালের ক্ল্যাসিক ঘড়ি। তরুণদের মধ্যে বড় ডায়াল, উজ্জ্বল নকশা, স্পোর্টি লুক কিংবা স্মার্টওয়াচের প্রতি আগ্রহ বেশি। আবার ফরমাল পোশাকের সঙ্গে পাতলা ডায়াল ও লেদার স্ট্র্যাপের ঘড়ি অনেকের পছন্দ।

পুরুষের পাশাপাশি নারীদের ঘড়িতেও এসেছে বৈচিত্র্য। ছোট ডায়াল, মেটালিক স্ট্র্যাপ, লেদার কিংবা বিভিন্ন রঙের নকশার ঘড়ি এখন পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ ঘড়ি এখন আলাদা কোনো অনুষঙ্গ নয়; পুরো সাজের অংশ।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে ঘড়ি : প্রযুক্তির অগ্রগতিতে ঘড়ির ব্যবহারেও এসেছে বড় পরিবর্তন। স্মার্টওয়াচ এখন সময় দেখানোর পাশাপাশি কল, বার্তা, ক্যালেন্ডার, ব্যায়ামের হিসাবসহ নানা সুবিধা দিচ্ছে। অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী অ্যানালগ ঘড়ি টিকে আছে তার সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের কারণে।

মোবাইল যতই আধুনিক হোক, ঘড়ির প্রয়োজন তাই পুরোপুরি শেষ হয়নি। কারণ ঘড়ি শুধু সময় জানায় না— এটি মানুষের রুচি প্রকাশ করে, পোশাককে সম্পূর্ণ করে এবং অনেক সময় ব্যক্তিত্বের একটি নীরব পরিচয় হয়ে ওঠে। সময় দেখার যন্ত্র থেকে ফ্যাশনের অনুষঙ্গ— এ পরিবর্তনই ঘড়িকে আধুনিক জীবনে এখনো প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত