প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২২ নভেম্বর, ২০২৫
লিও তলস্তয় কোনোদিনই শান্ত-সুবোধ প্রকৃতির ছিলেন না। যৌবনে প্রচুর ধারদেনা করেছেন এবং বিষয় সম্পত্তিও নষ্ট করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা কখনোই টানেনি তলস্তয়কে। বরং খামখেয়ালি, বিলাসী জীবনযাপন তাকে বেশি আকৃষ্ট করত।
বয়স আঠারো হওয়ার পর নিজের পৈতৃক সম্পত্তির অংশ হিসেবে জন্মস্থান রাশিয়ার ইয়াসনা পলিয়ানার বিশাল জমিদারির মালিকানা পেলেন, কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারনে অল্প দিনেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ভর্তি হলেন হাসপাতালে। হাসপাতালে থাকাকালীন তার হাতে এল বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের জীবনী, যা পড়ে তিনি জানতে পারলেন বেঞ্জামিন দিনশেষে তার দোষগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। ভাবলেন নিজেও এই অভ্যাস গড়ে তুলবেন। তুলেওছিলেন। বিয়ের আগে নিজের ডায়েরি তুলে দিয়েছিলেন স্ত্রীর হাতে। সব জেনে পরবর্তীকালে স্ত্রী সোফিয়াই তাঁকে ‘চরিত্রহীন’ বলেছিলেন।
পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়বার সময় হঠাৎ একদিন চার্লস ডিকেন্সের ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ পড়ে তলস্তয়ের মনে হয়েছিল, এই রকম একটা উপন্যাস তো তিনিও লিখতে পারেন। সেই থেকে শুরু লেখালেখি।
উপন্যাস লিখবেন বলে মনস্থির করেছেন ঠিক সেসময় বড় ভাই তাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন সেনাবাহিনীতে। যে-কারণে তাকে চলে যেতে হল ককেশাসে। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন সময়েই লেখালেখিতে হাতেখড়ি।
এদিকে লেখায় মনোনিবেশ করতে না করতেই ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হল। যুদ্ধের ভয়াবহতা তলস্তয়কে এতটাই আহত করল, যে তিনি যুদ্ধ শেষে সৈনিক পদ থেকে ইস্তফা দিলেন।
নিজের জমিদারিতে ফিরে এলেন আবার। আর কিছুদিন পর বেরিয়ে পড়লেন দেশ ভ্রমণে। ঘুরে বেড়ালেন বিভিন্ন দেশ। জেনেভার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখলেন ‘কসাক’ উপন্যাসটি।
তলস্তয়ের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল যে, নিচু তলার মানুষ থেকে শুরু করে রাজদরবারের লোকজন সবার সাথে ছিল তাঁর অবাধ মেলামেশা।
সম্রাটের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সর্বদাই মুখর ছিলেন তলস্তয়। স্বনামে ও বেনামে দেশের ভিতরে ও বাইরে জার-শাসনের সমালোচনা করে লিখলেন একাধিক লেখা। কিন্তু শাসক গোষ্ঠী ভয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিল না, তাদের মনে ভয় ছিল তলস্তয় যদি তাদের আরও দুর্নাম আর কেলেংকারির কথা লেখে তাহলে!
তলস্তয়, বিভিন্ন লেখার মধ্য দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক ঔদাসীন্যের অভিযোগ আনলেন। আদমশুমারিতে অংশ নিলেন। বিচারব্যবস্থায় আইনের নামে প্রহসন কীভাবে হয় তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য দিনের পর দিন আদালত আর জেলখানায় ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
তিনি যখন পাদ্রী-যাজকদের বিরুদ্ধে কথা বলা ও সমালোচনা শুরু করলেন, তখন তার শাস্তি স্বরূপ যাজক সম্প্রদায় ঘোষণা করল যে- তলস্তয়কে খ্রিস্টধর্ম থেকে বহিষ্কার করা হল, তিনি আর খ্রিস্টান বলে গণ্য হবেন না। যাজকদের বিচারসভা তলস্তয়কে ‘ধর্মত্যাগী’ ঘোষণা করল এবং সেই ঘোষণাপত্রটি রাশিয়ার সমস্ত গির্জার দরজায় সেঁটে দেওয়া হল।
চার্চ কর্তৃক বহিষ্কৃত হলেও মস্কোর রাজপথে তলস্তয়কে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানাল রাশিয়ার জনতা।
বেপরোয়া তলস্তয় এরপর যাজকদের উদ্দেশে বললেন- যারা ঈশ্বর ও যীশুকে নিয়ে ব্যবসা করে তাদের চেয়ে তিনি সহস্র গুণ বেশি ধার্মিক খ্রিস্টান, যা তাঁকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে না।
বিচারসভা একথা শুনে ক্ষেপে উঠল।এদিকে বিচারসভার ঘোষণার পর আলেক্সিয়েই সুভরিন নামে এক সাংবাদিক তাঁর পত্রিকায় লিখলেন, ‘আমাদের জার দুজন- দ্বিতীয় নিকোলাস ও লিও তলস্তয়।’
শোনা যায়, তলস্তয়ের হাতের লেখা নাকি একমাত্র তার স্ত্রী সোফিয়াই পড়তে পারতেন। তাই সোফিয়াকেই তলস্তয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে লেখা উদ্ধার করতে হত। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ উপন্যাসটির সাতটি খসড়া তৈরি করেছিল সোফিয়া। আবার কারও মতে সংখ্যাটি নাকি সাত নয় সাতেরো কিম্বা একুশ!
‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এই যুগান্তকারী রচনাটি লিখতে তলস্তয়ের সময় লেগেছিল দীর্ঘ পাঁচ বছর। উপন্যাসের মূল পটভূমি ছিল নেপোলিয়ন বোনাপার্টের রাশিয়া আক্রমণের প্রভাবসহ তৎকালীন রাশিয়ার সমাজব্যবস্থা।
একবার রাশিয়ায় দুর্ভিক্ষ হলো। আক্রান্ত অঞ্চল সরেজমিন ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়াতে লাগলেন তলস্তয়। এই সময়েরই ঘটনা। একটি মেয়ে রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করলে সেই ঘটনাকে নিয়ে লিখলেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনা কারেনিনা’।
ততদিনে যশ, খ্যাতি অর্থ-সম্পদের প্রতি কোনো মোহ নেই তাঁর। নিজের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। একদিন তলস্তয় ভাবলেন, সমস্ত অর্থ-সম্পদ দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দেবেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন স্ত্রী। স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ক্রমশই খারাপ হচ্ছিল।
শেষে তলস্তয় তাঁর সমস্ত সম্পত্তি স্ত্রীর নামে উইল করে দিয়ে গ্রামে ফিরে গেলেন। নিজের জমিদারিতে দরিদ্র চাষিদের ছেলে-মেয়েদের জন্য স্কুল খুললেন।
গ্রামের সাধারণ মানুষদের জীবনকে খুব কাছে থেকে দেখা শুরু করলেন তিনি। তাদের সঙ্গে কাজ করতে লাগলেন। এমন কি জুতো অবধি নিজে তৈরি করে পরতে লাগলেন। ক্ষেত মজুরের পোশাক পরলেন। নিরামিষ খাওয়া শুরু করলেন। ধূমপান ছেড়ে দিলেন একেবারে। পুরোদস্তুর সন্ন্যাসীদের মতোই জীবনযাপন শুরু করলেন।
এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বিতর্কিত উপন্যাস ‘ক্রয়োজার সোনাটা’। এই উপন্যাসে তিনি দেখালেন এক বৃদ্ধ ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণায় তার প্রতারক স্ত্রীকে খুন করেছে। ধারণা করা হয়, স্ত্রীর প্রতি বিদ্বেষ থেকেই তিনি এই বই লিখেছিলেন। বইটি সরকার নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করল।
বিরাশি বছর বয়সে স্ত্রীর নিষ্ঠুর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত চিকিৎসক দুশান মাকোভিস্ককে নিয়ে বাড়ি ছাড়লেন তলস্তয়।
হেমন্তের শেষের দিক। প্রচণ্ড ঠান্ডা। অন্ধকার রাত। মাকোভিস্ককে নিয়ে চুপিচুপি বাড়ির উঠানে নামলেন তলস্তয়। কোচোয়ানকে জাগিয়ে ঘোড়ার গাড়ি বের করালেন। ঘোড়া জোড়ার সময় তিনি নিজেও হাত লাগালেন। এরই মধ্যে মাথার টুপিটা গেল পড়ে। টর্চের আলোয় সেটা আর খুঁজে পেলেন না। টুপিহীন খালি মাথায় শিশির পড়তে লাগল। মাকোভিস্ক পরে তাঁর একটা বাড়তি টুপি তাঁকে দিলেন। কিন্তু ততক্ষণে যা ঠান্ডা লাগার লেগে গেছে। স্টেশনে পৌঁছে টিকিট কেটে গর্বাচভগামী ট্রেনে উঠে পড়লেন তলস্তয় ও মাকোভিস্ক।
তখন তলস্তয়ের পকেটে মাত্র ৩৯ রুবল, মাকোভিস্কের কাছে ৩০০ রুবল। তলস্তয় ঠিক করলেন যে তিনি নানা জায়গায় দু-চার দিন করে থাকবেন, যাতে স্ত্রী সোফিয়া তাঁর নাগাল না পান। বিকেলের দিকে তাঁরা কজেলস্কে নামলেন। ঝিসদ্রা নদী পার হয়ে এক আশ্রমে উঠলেন। পরদিন চলে গেলেন একমাত্র বোন মারিয়ার কাছে, যিনি তখন থাকেন শামর্দিন ভিক্ষুনি মঠে।
ততক্ষণে তলস্তয়ের খোঁজখবর শুরু হয়ে গেছে। গভর্নরের হুকুমে পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী তাঁর খোঁজে চতুর্দিক ছুটে বেড়াতে লাগল।
বোন মারিয়ার কাছে এক রাত থেকে পরদিন আবার কজেলস্কের উদ্দেশে রওনা হলেন তলস্তয়। সেখান থেকে রিয়াজান-উরাল রেলপথের ওপর রস্তোফ-না-দুন শহরের টিকিট কাটলেন। সকালবেলায় তাঁরা ট্রেনে উঠলেন।
বিকেলের দিকে তলস্তয়ের প্রচণ্ড জ্বর। দিকিন নামে স্টেশনে গাড়ি থামলে পুলিশের কাছে খবর গেল যে তলস্তয় এই ট্রেনেই আছেন। সন্ধ্যাবেলায় ট্রেন আস্তাপভ স্টেশনে থামল। তলস্তয় তখন জ্বরে কাঁপছেন। স্টেশন মাস্টারের সহযোগিতায় তাঁকে ট্রেন থেকে নামানো হল। ষ্টেশন মাস্টার তাঁর বাড়ির একটা কামরা ছেড়ে দিলেন তলস্তয়ের জন্য।
এদিকে পিতা তলস্তয়ের খোঁজ করে ছোট মেয়ে শাশা উপস্থিত হল দিকিনে। পরদিন এল বড় মেয়ে তানিয়া। আর তার পরদিন এল স্ত্রী সোফিয়া কিন্তু তাঁকে স্বামীর কাছে যেতে দেওয়া হল না।
তলস্তয় গুরুতর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। সারা রাশিয়া জুড়ে হুলস্থূলকাণ্ড। ঘণ্টায় ঘণ্টায় তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে সংবাদ বুলেটিন বেরোচ্ছে। টেলিগ্রাফ অফিস কাজ করে যাচ্ছে একনাগাড়ে।
প্রদেশের গভর্নররা মুহূর্তে মুহূর্তে খোঁজখবর নিচ্ছেন তলস্তয়ের। এরই মধ্যে একদিন রাতে জ্বরের ঘোরে তলস্তয় বিছানায় উঠে বসে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘মাশা, মাশা।’ সবাই অবাক। আসলে মাশা তাঁর মেয়ে, যে চার বছর আগে মারা গেছে।
পরদিন সন্ধ্যায় জ্বরের ঘোরে বকতে লাগলেন, ‘পালাতে হবে। পালিয়ে আমি যাবই। কেউ বিরক্ত করবে না এমন জায়গায় আমি চলে যাব।’
এ সময় স্ত্রী সোফিয়াকে তলস্তয়ের কাছে আনা হল। গির্জা থেকে একজন যাজককে পাঠানো হল, যদি তলস্তয় অনুশোচনা প্রকাশ করেন, তাহলে চার্চ তাঁকে পুনরায় গ্রহণ করবে। তলস্তয়ের অনুগামীরা যাজককে তলস্তয়ের কাছেই ঘেঁষতে দিল না। উল্টে তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিলেন।
১৯১০ সালের ২০ নভেম্বর মারা গেলেন তলস্তয়।
তলস্তয়ের দেহ আনা হল রাশিয়ার তুলা প্রদেশের ইয়াস্নায়া পলিয়ানায়। যে গ্রামে তিনি জন্মেছিলেন।
দেহ সমাহিত করার জন্য কবর খোঁড়া শুরু হল। ‘গির্জা ও রাষ্ট্রের শত্রু’ তলস্তয়ের কবর খুঁড়লেন তাঁর প্রিয় অনুগামীরা। বাড়ি থেকে সামান্য দূরে এক গাছতলায় সমাধি দেওয়া হল রাশিয়ার বিখ্যাত দার্শনিক-সাহিত্যিক লিও তলস্তয়কে।
সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তলস্তয়ের মৃত্যুতে যাজক সমাবৃত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কিম্বা ঘটা করে কোনো ধর্মানুষ্ঠান কিছুই হল না। রাশিয়া প্রথম একটি মৃত্যু দেখল, যেখানে গির্জা ও যাজকদের কোনো ভূমিকা ছিল না!