প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ মার্চ, ২০২৬
মাঘ মাস সবে শুরু, শীতের কামড় ততটা নেই এবার। মানুষের চাঞ্চল্য কমতে থাকে। বাড়ে পরিযায়ী পাখিদের মেলা; বসে নানা জায়গায়, পৌষের চিরকেলে রূপ বদলে গিয়েছিল এবার। মাঘের শীত বাঘের গায়ে- এমন কথা বলার জো ছিল না এবার। হাড়কাঁপানো শীতে কাবু ছিল তামাম মানুষ। মাবুদ আর জার দিও না- এমন কথা বলছে অশীতিপর বাসমতি বেগম। দশ বাই দশ মাপের মাসিক ছয় হাজার টাকায় নেওয়া ভাড়া কামরায় একমাত্র সন্তান দেল বকসের পরিবারের সঙ্গে থাকে। দেলের বাপ মহব্বত বকস দেলকে সাত বছরের রেখে বাজারের মালামাল টানতে গিয়ে সড়কে প্রাণ হারায়। জঠর জ্বালাজুড়াতে তখন বাসমতি বেগম স্কুলে স্কুলে ছাত্রীদের বাসা-টু-স্কুল দাইয়ের কাজ করত। বিকেলে পাড়ার রেস্টুরেন্টগুলোতে ঠিলাভর্তি পানি দিত টাকার বিনিময়ে। দেল বকসকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতে পাঠিয়েছিল। দেল বকসের তাতে মন নেই। গুলতি দিয়ে পাখি মারা, বেদেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোতে সময় দিয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে তিনবার ফেল করে টিসি নিয়ে মায়ের খুপরি ঘরে ফিরে বইপত্র যা ছিল তা দিয়ে সেদিনের ভাত-তরকারি রান্না করেছিল নিজেই। সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসমতি যখন সবে পিঁড়িতে বসে অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাসে পানি নিয়ে গলায় ঢালছিল, দেল ঘোষণা দেয়- স্কুলে আর পড়বেই না। গান গাইতে লাগল- লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে।
- মা, আমরা গরিব, গাড়ি ঘোড়ায় চড়মু না, লেহাপড়ারও দরকার নাই। তোমার কষ্ট করন লাগব না।
বাসমতি তখনো জানেনি। লোকমুখে শুনে চোখের জলেই নিজের ছেলেকে নিয়ে দেখা স্বপ্নের দাফন করেছিল। ছেলেকে নয়, নিজেকে আরো ব্যস্ত করে উপার্জনের পথ বাড়িয়েছিল।
বাসমতি বেগম ভাবে, কত বছর এইবারের মতো শীত পায় নাই। বেশি শীত শরীরে লাগলেই মৃত্যুচিন্তা এসে ভর করে তার মনে। কেবলই মনে হয়, এমন শীতের রাতে ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে মরে যাবে সে। কত কিছু ছেলেকে বলে নাই, আর বলার সময়ও নাই। আজকাল কথাও কম বলে, ঘরের এক কোণে মাটির মেঝেতে পুরনো আধছেঁড়া তোষকের মধ্যে শুয়ে থাকে।
মজলিশ বসেছে শহরে। রওশনচৌকির ঝলমলে আলোয় দেশ-বিদেশের নামকরা সব গায়ক এসেছেন। তাঁরা ভরা মজলিসের মধ্যমণি হয়ে গান গাইছেন। এসব গুণীর গজল শুনতে এসেছে দেল বকস পরনে দামি পোশাক। আতরের সুবাস লেগে আছে তাতে। তাম্বুল আর তামাকের মাদকতা চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। চারপাশে চাদরে মোড়া সফেদ তাকিয়া, তার একটিতে হেলান দিয়ে নিবিষ্ট হয়ে গান শুনছে দেল। ‘নায়না মোরে তাড়াস গায়ে আজা বালাম পারদেশী।’ কে যেন বললেন, কী চমৎকার গান গায় শুনুন। উনি বড়ে গুলাম আলী খাঁ। কিছুক্ষণ আগে গজল গাইলেন যেন কে? মিয়া তানসেনসহ আরও অনেকে। আব্দুল আলীমও রয়েছেন। দেল বকস চেনে তাঁকে। তার মন এক অপার্থিব আনন্দে নেচে ওঠে। দেল বকসের মেজাজে নবাবি শান লাগে। ‘ইয়াদ কিয়া পিয়া কি অ্যায়ে, ইয়ে দুখ সাহা না যায়ে’ গজল না, মধু মেখে যেন গাইলেন ওস্তাদরা। চারপাশ মুখরিত, সবাই বাহ বাহ সাধু সাধু করছে। কণ্ঠ আর সুরের মূর্ছনায় নিজের গলায় পরিধান করা গজমোতির হার ছুড়ে দিল বড়ে গুলাম আলীর দিকে দেল বকস।
বছর পঁয়ত্রিশের দেল বকসের চোখে তেরছাভাবে রোদ এসে পড়তেই ডান চোখ বন্ধ রেখে বাঁ-চোখ মিটমিট করে তাকায়। আধো ঘুমে আধো জাগরণে এক তন্দ্রাঘোরে বাস্তবে ফিরে আসে। চারপাশে শোরগোল চলছে, কান খাড়া আর চোখে সজাগ দৃষ্টি। রোজকার মতোই আজকের দিন শুরু হলেও তার মনের ভেতর তাড়াহুড়ো নেই। দেল ভাবছে, ঘুমের ঘোরে যা দেখল তা কি খোয়াব, না সত্য?
-উঠো না ক্যালা, কাম-বাম নাইক্যা নি, কোনহানকার বেলা কোনহানে গেছে কয়া পারি না। বলতে বলতে দেলের কাছে এসে কম্বলটা সরিয়ে নেয় সারিকা। দেল বকসের চোখে আর কিছু ধরা পড়ছে না, দেখে ওমরাওজান এসে তার হাত ধরে নাচতে আহ্বান করছে। দেল মোহিত হয়ে তার হাত ধরতেই এক ঝটকা দিয়ে সরিয়ে বলে - ছাড়ো। উঠো, কলপাড়ে যায়া কাপড়গুলা খলাইয়া কামে যাও।
বিরক্তি লুকিয়ে দেল নামে বিছানা থেকে, ধুৎশালা!
- হুমুদ্দির পুত, তিনটা মাইয়া বিয়াইয়া একটা পোলা পাওনের আশায় বউডারে পেট বাজাইছে। মায়ের পিনপিনানি আর ভাল্ লাগে না।
আরেকটা বিয়া করলে ইজ্জত থাকবোনি- ছাড়ুম না, কয়া দিলামণ্ড ফোঁস করে উঠেছিল বউডা।
তিনজন নাতিন গেলেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় বাসমতি বেগম। বলে- শয়তানের হাড্ডি সব। আমার পোলারডা খাইয়া শ্যাষ করতে এই দুন্নাইতে আইছে।
স্বপ্নের রেশ তখনো রয়ে গেছে দেলের। তারপরও ঘুমচোখে নিজের রোজকার কাজে যাওয়ার তাগিদে খালি পায়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়, দেখে বারোয়াড়ি উঠানের উত্তর দিকে মোড়া পেতে চোখ বন্ধ করে ঝিমাচ্ছে তার শ্বশুর ভোলা সরদার। একসময়ে ডাকসাইটে সরদার ছিল। এলাকার মানুষজন ভয় পেত তার দেহ আর কণ্ঠস্বরের জন্য। বয়সের ভারে ন্যূব্জ হয়ে গেছে। কানে কম শোনে, চোখে দিনে ঠাহর করতে পারলেও রাতে মানুষও অস্পষ্ট দেখে। কথাও বলে কম। অদূরে একটা পুরনো ফিকে লাল বালতিতে সর সর শব্দ করে অবিরাম পানি পড়ছে ট্যাপ দিয়ে। পাশেই ব্যবহৃত রঙের একটা ড্রামকে বালতি বানিয়ে গোসল ও কাপড়চোপড় ধোয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়।
উঠানের উত্তর-পশ্চিম কোণে রিকেট রোগীর মতো ঢাউস পেট নিয়ে তার রুগ্ণ বউ বসে উঁচু একটা প্লাস্টিকের টুলে। অসুবিধা হলেও খানিকটা গোড়ালি থেকে হাঁটুর কিছু নিচে শাড়িটা তুলে দুই পা দুদিকে প্রসারিত করে বসে। সামনে ছয়, চার আর দুই বছরের শাবানা, ববিতা ও রোজিনা। তাদের মাদুরে বসিয়ে একটা নিকেল করা গামলায় বতুয়া শাক ও খেসারি ডালের চচ্চড়ি দিয়ে ভাত মাখিয়ে গ্রাস তুলে দেয় সবার মুখে।
দেল বকসের মনটা সহসা খারাপ হয়। এই দুর্দিনের বাজারে এতজনের মুখে খাবার তুলে দিতে হিমশিম খেতে হয়। কয়েকদফা জন্মবিরতিকরণ বড়ি বউকে কিনে দেওয়ার পর একটি পুত্রসন্তানের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়, কপালে যা থাকে শেষ চেষ্টা করতে হবে। বংশের একমাত্র ছেলে ছিল মহব্বতের বাপ মকাই বকস। তার বাপের একমাত্র পুত্র দেল। ছেলের আশায় গুড়েবালি পড়েছে তিনবার। তিন মেয়ে এলে বউয়ের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিস্তার পেয়েছে মা ও ছেলে। দেল বকসের ভাবনা হয়, বৃদ্ধ মা ও ঘাড়ের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা শ্বশুরটাও মরে না- দুইটা খাওনের মুখ তো কমতো! যত দিন যায় মনে হতে থাকে, মাথার ওপর তিন মেয়ের নানান দায়িত্ব- লেখাপড়া, বিয়ে-শাদি। সকালবেলায় দেখা স্বপ্নটা দেলের মনে ভেসে ওঠে। চোখ টলটল করে। সেখান থেকে চোখ সরিয়ে কাপড় কাচতে বসে। পাশেই প্রতিবেশী মিতুনীর মা মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ স্বামীর গু-মুতের কাপড় নিয়ে বসে। অন্যদিনে চোখে চোখ পড়লে দুজনেই সৌজন্যমূলক মুখ টিপে হাসে। মিতুনীর মা শাপশাপান্ত করে গালিগালাজ করে। তার আসল নাম জানে না দেল। সে মনে মনে হাসে, বলে- সব মাইয়া মাইনসের একই স্বভাব। কিন্তু আজ দেল বকসের মেজাজ সপ্তমে। কোনোদিকে না তাকিয়ে শরীরের সব শক্তি দিয়ে বিছানার
চাদর-মশারি আর মেয়েদের মুতের কাঁথা ধুতে থাকে। বড় অস্থির সে। জীবনটাকে নিয়ে ক্লান্ত আর অবসন্ন।
গোসলখানায় ঢুকে দেখে সাবান কেসে পানিতে ডুবে আছে সাবান। অন্যদিন হলে সাবানটা হাতের তালুতে মুছে রাখতো। আজ তা করল না। ভিজে লুঙ্গি পরেই ফিরল ঘরে।
সারিকা মাদুর বিছিয়ে খাবার দিতেই হংকার দেয় দেল বকস- কী রানসো। রোজ এইগুলা খায় কোন হালায়? মরিচ পুড়াও নাইক্কা ক্যালা? এগল্যা খাইতে পারমু না।
সারিকার চিৎকার শোনা যায়-
-ডেইলি কি পোলাও-গোসত খাইবার মন চায়? আইন্যা দেইক, রাইন্ধ্যা দেওনের অসুবিধা নাইক্কা। খাওনের মুক কি কম? হুনি কয় ট্যাকা আমার হাত্তে আহে?
দেল কিছু না বলে খাবারের বাসন সরিয়ে উঠে যায়। দ্রুত বের হয়ে যায়। সারিকা চেঁচিয়ে বলে- আইজক্যা না খাইয়্যা থাকন লাগব। ঘরেত কিচ্ছু নাইক্যা।
বাসমতি বেগম হঠাৎ বলে ওঠে, যাওনের সময় এত কথা জিগাও ক্যালা? তোমার জ্বালায় দুইডা ভাতভি খাইবার পারল না। বকবকানি করবার লাগছে।
সারিকা ঝকমকিয়ে উঠে শাশুড়ির সামনে গিয়ে মুখ ঝাপটা দিয়ে বলে,
- কমু না তো কি চুম্মা খামু? ঘরে বালবাচ্চা কী খাইবো, ময়মুরুব্বিরা কী খাইবো- কওন যাইবো না ক্যালা? আমি কি বাপের বাইত থাইক্যা আইন্যা খিলামু?
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে জেনে খাবারের জন্য আসা সরদার ঘরের দরজা থেকে ফিরে যায়। পাড়ায় তার চেনা চায়ের দোকানে গিয়ে বনরুটি আর চা চাইলে দোকানি দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
দেল বকস গ্যারেজ থেকে রিকশা বের করে ঝাড়পোছা করে। এই বাহনটি তার নিজের হওয়ায় মায়া পড়ে গেছে। রিকশার নাম পঙ্খিরাজ। মাথায় সোনালি জরির একটা লাল মখমলের টোপর পরে, গুলিস্তানের ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে কেনা ছয়টা আংটি দু-হাতে পরে। পায়ে নাগরা শু। রিকশায় গোপন একটা বাকসে তালাচাবি দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখে সেসব। এসব পরার পর পরিবারের সবার কাছ থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়ে সে। এই তার সুখ। নিজেকে তখন সে এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। তখন তার চলন নবাবি হালের। পছন্দমতো সওয়ারি হলে দামদর করে না দেল বকস।
রিকশা চালাতে গিয়ে দেল বকস কিছু নিজস্ব নিয়ম মেনে চলে। আর যেসব নারী ও মেয়ে অপেক্ষাকৃত সুশ্রী নয়, সচ্ছল নয়, তাদের পেলে তারা যে টাকা ভাড়া দেয় তাতেই খুশি সে। রোজ দিনে দুইবার রিকশা চালায়। বাকি সময়টা তার নিজের। সিনেমা হলের বাউন্ডারিতে, তো কখনও নাটকপাড়ায় দেখা যায় তাকে। যে-চায়ের দোকানে গান বাজানো হয়, সেখানে সে বসে থাকে, একের পর এক বেনসন রেড সিগারেট আর চা খায়।
দেল বকস দিনের শুরুতে যে-স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগেছিল সেই স্মৃতি তার মাথায় কাঠঠোকরার মতো ঠক্ ঠক্ করে। কেন যে গরিব মানুষের শখণ্ডআহ্লাদ পূরণ হয় না! দেল বকস ভাবে, গরিব হওয়া কোনো অপরাধ নয়, দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে হলে কঠোর সাধনা লাগে, কখনও সুযোগ আর আগ্রহের দরকার পড়ে।
গেল সপ্তাহে একজন সওয়ারি বাবা তার মেয়েকে নিয়ে শিল্পকলায় গিয়েছিল। কান খাড়া করে শুনেছিল শিশুটি তার বাপকে বলেছিল,
-বাবাই, তুমি কেন গান গাইতে পারো না?
-আমরা তো ছোটবেলায় গরিব ছিলাম, প্রতিদিন তিনবেলা পেটপুরে খেতে পেতাম না, গান শেখার সুযোগটা ছিল না। তবে গ্রামের যাত্রাপালার অনেক গান মুখস্থ আছে। শুনবি?
শিশুটির অনুরোধে একটা গান গাওয়া শেষ হলে মেয়েটি বলে, বাবাই, তুমি খুব সুন্দর করে গাইলে।
সে আরো বলে, বাবাই, তুমি বাসায় আমার সঙ্গে বসে কায়দা পড়ো, গানও তো গাইতে পারি আমরা?
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভদ্রলোক বলে ওঠেন, গাইবোরে মা।
দেল বকসকে ঘটনাটি ছুঁয়ে যায়। তক্ষুনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, গানটা সে শিখবেই। আব্দুল জব্বার, তানসেন, বড়ে গুলাম আলীদের মতো বিখ্যাত না হোক, মন খুলে গান গাইতে পারলে সব কষ্ট শুষে নিতে পারবে দেল। পঙ্খিরাজ চালাতে চালাতে ভাবে, সে পরিশ্রম বাড়িয়ে দেবে, সংসারের দায়িত্বে আরো মনোযোগী হবে।
-অ্যাই যে ভাই, ভাড়া কত?
-দেন স্যার যা মন চায়।
-সে কী কথা, বলুন তো কত?
দেল বকসের কী হয় কে জানে-
-স্যার?
-জি বলুন।
-আমারে স্বপ্ন দেখাইছেন, বাঁচতে শিখাইলেন। কোন জায়গায় গান শিখতে পারমু জানাইবেন স্যার?
মেয়েটি অবাক হয়ে শোনে দুজন মানুষের কথোপকথন।
কৃতজ্ঞতা : কালি ও কলম