প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ জুলাই, ২০২৬
সম্প্রতি কবি সৈকত হাবিবের সদ্য আলোর মুখ দেখা ‘কবিতা সংগ্রহ‘ বইটি হাতে পেয়েছি। বইটির সম্পাদনা, প্রিন্টিং ও বাইন্ডিং বেশ মোহনীয়। আর তা সম্ভব হয়েছে সৈকত হাবিব নিজে সম্পাদক ও প্রকাশক হওয়াতে। এটি প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। বইটি কবি উৎসর্গ করেছেন তার বাবা ডা. আবদুল বারী শিকদারকে। সৈকত হাবিবকে আমি প্রাবন্ধিক ও গবেষক হিসেবে শক্তিমান মনে করতাম। কিন্তু এ বইটি পড়ার পর আমার সে ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কবিতায় তার শক্তিমত্তার বিষয়টিও।
তার কবিতাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অ্যালিগোরিক্যাল। প্রেম, বিরহ আর বেদনার পাশাপাশি ওঠে এসেছে সমসাময়িক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নির্মোহ সমালোচনা। কবিতার ক্যানভাস তৈরিতে কোনো অশুভ কিংবা অসুন্দরের সঙ্গে তিনি আপস করেননি। যেমন এ বইয়ের প্রথম কবিতা ‘নারায়ণের হাট’ কবিতার শেষাংশে তিনি বলেছেন, ‘কখনো দেখিনি আমি এই জন্মে/দেখেছি কেবল নদীর শব আর রক্ত/আর ধূলিদীর্ণ এক নারায়ণ-মুখ।’
বইটির আরেক অনবদ্য কবিতা ‘রাত্রির জন্য গান‘। দীর্ঘ এ কবিতায় কবি রাত্রির চিরায়ত হাহাকারের কথা যেমন বলেছেন তেমনি বলেছেন বর্তমান সময়ে পরিবর্তিত রাত্রির অবস্থা নিয়েও। কবি লিখেছেন, ‘রাত্রি এক রহস্যময় কবিতা/আমরা তা পাঠ করি সমগ্র জীবন/রাত্রি বিচিত্রজটিল গ্রন্থ এক/ক্রমাগত আমরা তা নিমার্ণ করি।’ এ কবিতা শেষ হয়েছে দারুণ শব্দমালা দিয়ে। কবি লিখেছেন, ‘পৃথিবীর দীর্ঘতর সড়কে আমরা হেঁটে যাই/ক্লান্তিমগ্ন পান্থ, এই রাত্রি আমাদের নিবিড় স্টেশন/আমাদের ক্লান্তিহননের গান।’
মানুষের বিধ্বংসী কর্মফল নিয়ে আরেক দুর্দান্ত কবিতা ‘মহাশূন্য থেকে ফিরে‘। কবি লিখেছেন, ‘অমরত্ব চেয়েছি একদিন, পেয়েছি/ঘুরেছি মহাপৃথিবীর পথে পথে, দেখেছি/মঙ্গলে অমঙ্গল বয়ে নিয়ে গেছে মানুষ/আর/ মানুষ হত্যা করেছে তার মৃত্তিকাজননীকে/আজও শূন্যে শূন্যে তারা বয়ে নিয়ে যায়/হত্যার গানৃ।’
‘জনৈক বলছেন তার নিঃসঙ্গতা বিষয়ে’ কবিতায় নিঃসঙ্গতা নিয়ে কী শক্তিশালী কথা বলেছেন কবি: ‘নিঃসঙ্গতা, তুমি আমার নিয়তি, মরজন্মের সখা।’ তার ‘নার্সিসাস’ কবিতাটি যেন আমাদের চরিত্রের নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা। কবি লিখেছেন, ‘আমার হাতে সভ্যতার রক্তচিহ্ন/চোখে লোভ, ক্রূরপিপাসা/নরমুণ্ডু-স্বাদে দৃঢ় চোয়ালের হাড়।’
‘আমরা কেবলই চায়ের টেবিলে ঝড় অংশের ‘পাখি জানে’ কবিতায় শূন্যতাকে পূর্ণতা হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি বলেছেন, ‘শূন্যতার মানে/পাখি জানে/তাই এত/তার/ডানার/বিস্তার।’ হুমায়ুন আজাদ স্মরণে ‘ফিনিক্সের জন্য অ-শোকগান’ শিরোনামে অসাধারণ এক কবিতা লিখেছেন কবি। কবি লিখেছেন, ‘কে জানে কোন ভস্ম থেকে উত্থিত হবে তুমি/ফিনিক্স আমার ফিনিক্স আমার ফিনিক্স।’
‘আমরা কেবলই চায়ের টেবিলে ঝড়’ কবিতায় কী চমৎকারভাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি। কবি লিখেছেন, ‘যখন নিহত সব সুন্দর/বন্ধ বন্দর, রুদ্ধ অন্দর/আমরা তবুও মাতাল-কপট, শত্রু পরস্পর/তখনো আমরা কেবলই চায়ের টেবিলে ঝড়।’ অতীতের শাহবাগ আর বর্তমানের শাহবাগ নিয়ে কবি দারুণ এক কবিতা লিখেছেন। কবি ‘শাহবাগ’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আজও আমি শাহবাগে যাই/পৃথিবীর এক গতসুযৌবনা শাহবাগে/পুরনো স্বপ্নের ঘ্রাণে/উষ্ণতা খুঁজে পাই।’
‘রক্ত দিয়ে লেখা কবিতা’ অংশে ‘বাসনামধ’ কবিতায় কবি চমৎকারভাবে কবিতার সর্বজনীন শক্তিমত্তার বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি লিখেছেন, ‘কী সেই বাসনামধু, যা তোমাকে বলে, কবিতাবতী হও মেয়ে, পাঠ করো কবির হৃদয় আর তোমার ভেতর ফলাও কাব্যবীজ.../ তবু সব দুয়ার রুদ্ধ করে, কেনো আমরা শুধু কবিতার কাছে ফিরে ফিরে যাই।’
‘বন্ধুরা সব বড় হতে থাকে’ কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের এক প্রগাঢ় বাস্তবতা। কবি লিখেছেন, ‘বন্ধুরা সব বড় হতে থাকে/আমি হতে থাকি ছোট/বন্ধুরা বাড়ে পদে ও পোঁদে, তাপে ও প্রতাপে/বাড়ে গাড়ি ও বাড়িতে, মাড়ি ও নারীতে/কেতা ও কানুন আর ধোপে-দূরস্তে/বেড়ে চলে স্বাদে ও মদে, হাবে ও ভাবে।’
‘রক্ত দিয়ে লেখা কবিতা’ কবি কবিতার জয়গান গেয়েছেন। কবি লিখেছেন, ‘কবিতা লেখা হয় হৃদয়রক্ত দিয়ে/এ কোনো ব্লাডব্যাংকে পাবে না/তাই ইতরসম প্রসব কোরো না/শেষে ঝরে ঝরে রক্তশূন্য হলে/জীবনই থাকবে না, তায় কবিতা।’ কবি ‘মানুষজীবন’ কবিতায় মানবজীবনের অমোঘ সত্যটি তুলে ধরেছেন। কবি লিখেছেন, ‘কত যে ভুল/আর/মিথ্যা/এই মানুষজীবন।’
‘মানুষ, বৃক্ষ হও’ কবিতায় কবি মানুষকে বৃক্ষের উদাহরণ দেখিয়ে মানুষেরমতো ‘মানুষ’ হতে আহ্বান জানিয়েছেন। কবি লিখেছেন, ‘মানুষ, তুমি আরো একটু মানুষ হও, আরো একটু মানবিক। বৃক্ষের মতো হও আনত, সহজ ও সবুজ...’
‘কবিতা সংগ্রহ’ কবি সৈকত হাবিবের কাব্যজীবনের শ্রেষ্ঠ নির্মাণ বলে মনে করি। যেখানে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সমস্ত আনন্দ, বেদনা ও হাহাকার ফুটে ওঠেছে নিদারুণভাবে।