প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
ভোরের আলো তখনও ঠিকমতো ছড়িয়ে পড়েনি। আবাসিক এলাকার পুকুরপাড়ে অস্বস্তি জমে উঠেছিল। ঠান্ডা বাতাসে ধোঁয়ার মতো ভাসছিল এক ধরনের অদৃশ্য উৎকণ্ঠা। একটা মা-কুকুর বারবার একই পথে দৌড়াচ্ছিল, যেন কোথাও কিছু ফেলে এসেছে। তার স্তনে দুধ জমে আছে। আশপাশে কোনো ক্ষুধার্ত সন্তানের ডাক নেই। গ্যারেজঘরের কোণও ফাঁকা। যেখানে আটটি ছোট শরীর কাল রাতেও নড়ছিল। সে নাক মাটিতে ঠেকিয়ে গন্ধ খোঁজে, বারবার খোঁজে। গন্ধ কেটে গিয়ে, সেখানে মানুষের পায়ের ছাপ আর ভয় একাকার। সে পুকুরের দিকে বারবার তাকায়। ঠিক যেন জল তাকে কিছু বলছে। জলের ওপর ভাসতে থাকা একটা বস্তা তার নজরে আসে। সে দৃষ্টি স্থির করে। আজ এখানে অন্যদিনের মতো পাখিরা ডাকছে না। এই পাড়টা যেন এড়িয়ে চলে গেছে তারা। মা-কুকুর হঠাৎ থেমে দাঁড়ায়, কান খাড়া করল। কিছু সে বুঝতে ছায়। তার বুকের ভেতর অস্থিরতার ঢেউ উঠে, উঠতে উঠতে গলা পর্যন্ত আসে। কান্না বেরোয় না, শুধু শ্বাস ভারী হয়ে থাকে।
পুকুর পাড়ের দোকানগুলো খুলতে শুরু করেছে। মানুষরা আসে, আসে কোলাহল, চায়ের ধোঁয়া গন্ধ। চা দোকানী আক্কাস দেখে ফেলে পুকুরের মাঝখানের ভাসমান জিনিসটা। সে দোকানী জাফর আর ফরহাদকে বলে। এরপর থেমে নেই কথা। একে আরেকজনকে ডাকে, কৌতূহল ভিড় করে। বস্তাটা টেনে তোলা হয়। হাত কাঁপে রাব্বির। তবু উপস্থিত জনতার সামনে খোলা হয় গিঁট। তখনি ভেতরের দৃশ্য মুহূর্তে কথা থামিয়ে দেয় সবার। আটটা নীলচে ছোট শরীর বেরিয়ে আসে। মুখ ফিরিয়ে নেয় কেউ, কেউ অভিশাপ দেয়। মা-কুকুর তখন ভিড় ঠেলে দাঁড়ায়। সে একটার পর একটা গন্ধ শোঁকে। তারপর স্থির হয়ে বসে পড়ে। সেই স্থিরতায় এই শহরের প্রথম অপরাধ লেখা হয়ে যায়।
খবর ছড়াতে সময় লাগেনি। এই শহরে নিষ্ঠুরতার গন্ধ দ্রুত ছড়ায়। দোকানদাদের চোখে চোখে কথা চলে। পথচারীরা বলে মানুষ এমন করতে পারে না, কেউ বলে মানুষই সবচেয়ে ভয়ংকর। পুকুরপাড়ে ভিড় জমে, কেউ ছবি তোলে। মা-কুকুরটা তখনও বসে আছে শূন্যের দিকে তাকিয়ে। তার ফিকে দৃষ্টি বলে দেয়, সে আর কিছু প্রত্যাশা করছে না।
দোকানী জাফর, ফরহাদ, রাব্বি এবং অন্যলোকেরা একটি বাড়ির দিকে দেখতে থাকে, আর হিসাব মেলাতে থাকে। কে করতে পারে এমন ঘৃণ্য কাজ আন্দাজ করতে চায়। প্রীতিনিকেতন ভবনের নাম উচ্চারিত হলে কথার সুর বদলে যায়। ওখানে ভদ্রলোকেরা থাকে, শিক্ষিত মানুষ, ক্ষমতার সঙ্গে যাদের চলাফেরা। সন্দেহ যেন হঠাৎ করেই শিষ্টাচারের কাছে থেমে যায়। মুখ চাওয়াচাওয়ি করে এর ও। জোরে কিছু বলে না, চাপা ফিসফিসে নাম আসে যায়। একজন বলে, ‘ভোরে ঐ ছাদের দিক থেকে শব্দ পেয়েছি।’ আরেকজন বলে, ‘আমি ছায়ার মতো কিছু উড়ে পড়তে দেখেছি। তবে আমি ঝামেলায় যেতে চাই না।’
আক্কাস ভাবে, ‘ভয় এখানে অদৃশ্য হলেও খুব বাস্তব। ওরা মিথ্যেবাদী নয়। তাই বলে পুলিশ এলে এদের নাম বলা যাবে না। তারাই তদন্ত করে যা পারে বের করুক। তবে পুলিশে জানানো হবে কি না, এখনও বোঝা যাচ্ছে না। তা নিয়েই আলোচনা চলছে।’
জাফর তার চকচকে কালো হাত নেড়ে বলে, ‘এসব ঘটনায় কিছু হয় না।’
সাথে সাথে প্রতিবাদ করে রাব্বি। বলে, ‘কুকুরের বাচ্চা বলে কি বিচার হবে না?’
ওদের অলোচনার মাঝখানে সত্যটা চাপা পড়তে থাকে। মা-কুকুর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে, যেন কাউকে চিনে ফেলেছে। তার চোখের দৃষ্টি একটা নির্দিষ্ট দালানের দিকে আটকে যায়। দালানটা তখনো শান্ত, জানালাগুলো বন্ধ। ভেতরে কেউ হয়ত ব্যস্ত, কেউ নির্বিকার। একটা দরজা খুলে আবার বন্ধ হয়। আর সেই শব্দে মা-কুকুরের শেষ ভরসাটুকুও ভেঙে পড়ে।
উপস্থিত জনতা ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, সত্যকে কতদূর যেতে দেওয়া হবে। প্রীতিনিকেতন ভবনের ভেতরে আলো ঝলমল করছে। কিন্তু আভ্যন্তরীণ অন্ধকার বেশি। ওই বাড়িতে থাকে ফাহিমা। যার মুখে সবসময় লেগে থাকে হাসি, চোখে অন্যকিছু। সে সমাজে ভদ্র, শিক্ষিত, বিসিএস কর্মকর্তার স্ত্রী হলেও ঘরে সে অন্য। বাড়ির অন্যদের অজান্তে হাতে ব্যাগ নিয়ে ভোরে সে ছাদে উঠেছিল। সেই ব্যাগ কাক-পক্ষী জেগে ওঠার আগেই পুকুরে নিক্ষেপ করেছিল। তার ভেতরের আটটি প্রাণ আর নেই। ঐ নিয়ে শহর জেগে ওঠেছে। সে বুঝতে পেরে ক্রু-হাসে। কুঁ-কুঁ-কুঁই বিরক্তিহীন ডাক আর শুনতে হবে না, ভেবে তৃপ্তি পায়।
ভিড়ের অনেকেই ভাবে, মানুষরূপী ফাহিমা নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য সব করতে পারে। তাকে দেখে পাড়ার নতুনেরা ভাবতে পারবে না সে অপরাধী। তার প্রতি আস্থা আর শ্রদ্ধা দিতে দ্বিধা করে না, সে বিশ্বাস কেড়ে নেয়।
জানালা খুলে হট্টোগেলের দিকে চোখ রাখতেই পায়ের নিচের মাটি সরে গেল ফাহিমার। আত্মা শুকিয়ে গেল। তার পরিচিতি প্রকাশ পেলেই সবাই অবাক হবে। সে জানে, এই শহরে ক্ষমতা সবসময় সত্যের উপরে থাকে। এখনও কেউ কিছু বলতে সাহস না পেলেও, সবার চোখ তার দিকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা, যারা সকাল থেকে ঘটনাটি দেখেছে, তারা ফিসফিস করে বলে, ‘তার মুখোশ ছিন্ন করে দাও।’ কেউ আবার বললো, ‘এভাবে কিছু হবে না। পুলিশ ডাকো।’
ফাহিমা জানে, তার গোপন তার কাণ্ডের চিহ্ন শুধু পুকুর জানে। সে কুকুরের কান্না, কোলাহল, গোপন রহস্যসব দূরে ঠেলে নিশ্চিত শ্বাস ছাড়ে। তারপর সে ভেতরে ঢুকে নিজের কাজে মন দেয়। তবুও একটা ভাবনা খচ্খচ করে, অন্ধকারে নিরাপদ ছিল, সে জন্যই পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করেছিল। কিন্তু এখন? পুকুরপাড়ের মানুষের আভ্যন্তরীণ ধ্বনিতে ভীত হয়। মা-কুকুর জানে কি কে তার সন্তানকে হত্যা করেছে?
রিমা নামের একজন প্রতিবেশী সকাল থেকেই পুকুরপাড়ে ঘুরছিল। সে কিছুটা লাজুক, কিছুটা সাহসী, তবে সত্য প্রকাশের জন্য শক্তি রাখে। ভোরের ওই দৃশ্য বিপরীত দিকের অন্ধকার বারান্ধায় বসে সে দেখেছিল। যা তার চোখে লেগে আছে। তারপর থেকেই মনে হয়েছে, অন্যায় হয়েছে, কীভাবে প্রমাণ দেবে? সে ঠিক করে, কেউ যদি এই অন্যায় ধামাচাপা দেয়, তা সে মানবে না। কিন্তু এই হন্তারককে ধরা সম্ভব কি? মানুষের সমাজে ন্যায় বা অন্যায়-সবই মুখোশে ঢাকা। সত্য কথা বললেই হুমকি আসে, চুপ থাকলেই নীরবতা বড় হয়। রিমা প্রতিজ্ঞা করে। তার প্রতিজ্ঞা সমাজের অন্ধকারের বিপরীতে আভ্যন্তরীণ যুদ্ধ।
অস্থিরতার মধ্যে আক্কাস তখনও দাঁড়িয়ে। জাফরের কানে ফিসফিস করে বলে, ‘আমাদের সমাজে কী হচ্ছে? এমন নিঠুরতা মানা যায়?’
জাফর ফিসফিস করে, ‘সবকিছুই ঘটানো যায়, দেখার কেউ নেই।’
প্রীতিনিকেতনের জানালা বন্ধ। বাইরে তাকাচ্ছে না কেউ। যেন সবই স্বাভাবিক। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয় রিমার। সে ভাবছে, মানুষ নিজেই অন্যায়কে আঁকড়ে ধরে রাখে। কুকুরের কান্না মনে রাখে না কেউ, সবাই ব্যস্ত নিজেদের কাজে। সত্য প্রকাশের জন্য সাহস খুব কম মানুষ রাখে। একজন তার কানের কাছে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমরা কি প্রতিবাদ করব, নাকি চুপ থাকব?’ সে উত্তর দেয় না। মানুষের মুখোশ সমাজকে চালিত করে, আর সত্য শুধু ছায়া। রিমা জানে না, এই দ্বিচারিতা কতটা শক্তিশালী। শিক্ষিত মানুষ বড় বড় নীতিকথা বলে, কাজ করে নিজের স্বার্থে। শক্তিশালী ব্যক্তিরা অপরাধকে ঢেকে রাখে, আর সাধারণ মানুষ নীরব থাকে।
লোকেরা জানে, ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের সত্য প্রকাশ হলে বিপদ বাড়বে। তারা বুঝতে পারছে, বিচার এখন মানুষের হাতে নেই, ক্ষমতার খেলার মধ্যে আটকে আছে। পুকুরের জল শান্ত। ঘটনাটির ভয় এখনও মিশে আছে বাতাসে। প্রত্যক্ষদর্শীরা শ্বাস বন্ধ করে দেখছে। কোনো প্রমাণ সহজে বের করা যাচ্ছে না, কারণ সবই নিখুঁতভাবে ঢাকা। রিমা ভাবছে, যদি সত্য বের হয়, দোষি কি শাস্তি পাবে? বাস্তবতা বলছে, শক্তিশালী সবসময় নিজের পক্ষে মোড় ঘুরিয়ে নেয়। নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন, প্রতিটি পদক্ষেপেই ঝুঁকি আছে। মানুষরূপী এই হন্তারককে ধরে রাখা সম্ভব কি? মা-কুকুর পাড়ে বসে আছে, কোনো সহায়তা আশা করছে না। রিমা একা লড়বে সিদ্ধান্ত নেয়। সে মুখ ঢেকে দূরের ফোনদোকান থেকে থানায় ফোন করে।
পুকুরপাড়ে নেমে আসে রোদের দল। প্রীতিনিকেতন থেকে হঠাৎ একটি ছায়া বেরিয়ে আসে, বস্তা ধরে নিয়ে যেতে চায়। সবাই চমকে তাকায়। ছায়াটি ফাহিমার কাজের মেয়ের। রিমা দ্রুত এগিয়ে এসে, বলে, ‘এটি কোথাও নেয়া হবে না’ অন্যরা রুখে দেবার সাহস দেখায় না। মা-কুকুর হঠাৎ ছুটে যায়, বস্তার দিকে ঝাঁপ দেয়, আর কিছু করা সম্ভব নয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা সরে দাঁড়ায়। মেয়েটি বস্তা ফেলে চলে যায়।
মা-কুকুর বাড়িটির দিকে তাকায়, সে যেন জানে, প্রতিশোধ এখনও বাকি। রিমা হৃদয়ের গভীরে অনুভব করছে, মানুষের নৈতিকতা কতটা ফাঁপা। প্রীতিনিকেতন ভবনের দেয়ালের ভেতর হয়ত কেউ হাসছে। পুলিশের দু’টি গাড়ি পুকুরপাড়ে এসে দাঁড়ায়। বুঝা যচ্ছে তারা কেউ এই বিষয়ে খুব আগ্রহী নয়। তদন্ত শুরু হয়েছে ভানমূর্তিতে, যেন কেউ সত্যিকারের বিচার চায় না। রিমা সেখানে দাঁড়িয়ে দেখছে। মানুষদের চোখেও অদৃশ্য চাপ স্পষ্ট। প্রীতিনিকেতন ভবনের দিকে তাকালে মনে হয়, আড়াল থেকে কেউ সব দেখছে, কিছু বলছে না। পুলিশের কর্মকর্তারা নথি নাচাচ্ছেন, তার কোন অস্থিরতা নেই। উপস্থিত প্রত্যেকে চাইছে তদন্ত। তিনি চাইছেন সময় কাটুক।
পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনে ফাহিমা ব্যালকনিতে দাঁড়াল। রিমার চোখে অদৃশ্য প্রশান্তি, তার একা লাগে না। মানুষ এবার মুখ খুলছে, সত্যের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের দায়িত্ব বুঝতে শুরু করছে আক্কাস, জাফর, রাব্বিসহ অন্যরা। তারা সাক্ষ্য দিচ্ছে এমন নিকৃষ্ট কাজ কে করতে পারে। ফাহিমা তখনও ব্যালকনিতে স্থির।