প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
যে জন্মেছে সে মরবেই। যার সূচনা হয়েছে তার সমাপ্তি ঘটবেই। এটা আল্লাহ তাআলার শাশ্বত চিরন্তন বিধান। এ বিধানের পরিবর্তন নেই। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে চির ও অনড় সত্য মৃত্যু। মৃত্যু অবধারিত। মানুষের বেঁচে থাকাটা অস্বাভাবিক, কিন্তু মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক। পৃথিবীর প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে নির্ধারিত জীবনযাপনের পর কেউ আর বেঁচে নেই। তাই পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে কবরের সংখ্যা বেশি।
প্রত্যেক প্রাণীই মরণশীল : প্রত্যেক প্রাণীকে মরতে হবে। ছারপোঁকা থেকে শুরু করে প্রাণওয়ালা যত সৃষ্টিজীব আছে সবাইকে মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যুর কবল থেকে জগতের কোনো তাবৎ পরাশক্তি, কোনো প্রযুক্তি কাউকে বাঁচাতে পারবে না। মৃত্যুর কাছে সবাই অক্ষম। মৃত্যুর নির্ধারিত সময় থেকে এক সেকেন্ডও বেশি বেঁচে থাকার ক্ষমতা কারও নেই। মৃত্যুর অনিবার্য স্বাদ প্রত্যেক প্রাণীকে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আনয়াম : ১৮৫)।
বেলা শেষে সূর্য যেমন বিদায় নেয়, তেমনি মানুষকেও বিদায় নিতে হয়। সূর্যের অস্ত যেমন কেউ ঠেকাতে পারে না, মানুষের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তাকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না। নির্ধারিত সময়ে তার মৃত্যু হবে। আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু তিনি তাদেরকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন। তারপর যখন তাদের নির্দিষ্ট কাল এসে পড়বে, তখন তারা মুহূর্তকালও পেছনে যেতে পারবে না এবং সামনেও যেতে পারবে না।’ (সুরা নাহল : ৬১)।
মৃত্যু মানুষের নাগাল পাবেই : জীবন ফুরিয়ে গেলে পৃথিবীতে থাকার অধিকার নেই কারও। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার উপায় নেই। পালিয়ে বেড়ানোর জায়গা নেই। কেউ চাইলেও মৃত্যুকে পাশ কাটাতে পারবে না। সময় হলে মরতে হবেই। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যেখানেই থাক (একদিন না একদিন) মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, চাই তোমরা সুরক্ষিত কোনো দুর্গেই থাক না কেন।’ (সুরা নিসা : ৭৮)।
বিলম্বের অবকাশ নেই : মৃত্যু কোনো সংবাদপত্র নয়। ডাকপিয়নও নয়। সে সংবাদ না দিয়ে না জানিয়ে চলে আসে। মুমিনের উচিত, মৃত্যুর জন্য সবসময় প্রস্তত থাকা। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য এক নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন তাদের সেই নির্দিষ্ট সময় এসে পড়ে, তখন তারা এক মুহূর্তও বিলম্ব করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না।’ (সুরা আরাফ : ৩৪)।
আরেক আয়াতে আছে, ‘যারা আল্লাহর সঙ্গে মিলিতি হওয়ার আশা রাখে, তাদের নিশ্চিত থাকা উচিত, আল্লাহর নির্ধারিত কাল অবশ্যই আসবে।’ (সুরা আনকাবুত : ৫)।
দুনিয়াতে আসার ধারাবাহিক পরিক্রমা আছে, প্রথমে দাদা পরে পিতা তারপর নাতি। কিন্তু চলে যাওয়ার ধারাবাহিকতা নেই। ডাক আসলেই পরপারে চলে যেতে হবে। সামান্য সময়ের ফুরসৎ দেওয়া হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘যখন কারও নির্ধারিত কাল এসে যাবে, তখন আল্লাহ তাকে কিছুতেই অবকাশ দেবেন না। আর তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ সে সম্পর্ক পরিপূর্ণ অবহিত।’ (সুরা মুনাফিকুন : ১১)।
মৃত্যু থেকে পালানোর সুযোগ নেই : মানুষ দুনিয়ার মোহে পড়ে আল্লাহকে ভুলে যায়। আল্লাহর আদেশ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ ভুলে যায়। দুনিয়া নিয়ে মত্ত হয়ে পড়ে। দুনিয়াকে নানা কৌশল ও নানা ব্যবস্থাপনায় সাজাতে ব্যস্ত থাকে। মৃত্যুর কথা ভুলে যায়। পালিয়ে বেড়াতে চায়। অথচ মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন, ‘মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যিই আসবে। (হে মানুষ,) এটাই সে জিনিস যা থেকে তুমি পালাতে চাইতে।’ (সুরা কাফ : ১৯)।
কোথায় মৃত্যু হবে, জানা নেই : মৃত্যু কাউকে জানান দিয়ে আসে না। কোনো সময় বা নির্ধারিত স্থান ধরে উপস্থিত হয় না। মানুষ জানে না, কার মৃত্যু কোথায় কোন জায়গায় হবে। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো প্রাণী এটাও জানে না যে, কোন ভূমিতে তার মৃত্যু হবে।’ ( সুরা লুকমান : ৩৪)।
দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। পৃথিবী তার অস্তিত্ব হারাবে। পৃথিবীতে মানুষের চিহ্ন থাকবে না। এই ধ্বংসশীল দুনিয়াতে মানুষও ধ্বংসশীল।
পৃথিবীতে মানুষ মুসাফির। জীবনের নির্ধারিত সময়ের ভেতর পুঁজি সংগ্রহ করে পথ চলতে হবে। ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার বাহুমূলে ধরে বললেন, দুনিয়াতে এমনভাবে অবস্থান করো যেন তুমি মুসাফির বা পথিক।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন সন্ধ্যা হয়ে যায় সকালের অপেক্ষা করো না। আর যখন সকাল হয়ে যায় সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। সুস্বাস্থের দিনগুলোতে রোগব্যাধির প্রস্তুতি নাও। আর জীবদ্ধশায় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করো।’ (বোখারি : ৬৪১৬)।
মৃত্যুর স্মরণ অন্তরকে জাগিয়ে রাখে : আমাদের মন পরিশুদ্ধ করা প্রয়োজন। মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা দরকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘(দুনিয়ার) স্বাদ গন্ধকে বিলুপ্তকারী মৃত্যুকে তোমরা বেশি বেশি স্মরণ করো। (তিরমিজি : ২৩০৭)। পৃথিবীর শাশ্বত চিরন্তন সত্য মৃত্যু। একমাত্র আল্লাহই চিরঞ্জীব। তিনি ছিলেন। আছেন। থাকবেনও। তিনি ছাড়া সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। এমনকি মৃত্যুর ফেরেশতারও মৃত্যু হবে।