ঢাকা সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রমজানে করুন এই ছয় আমল

হাসসান ফাহিম
রমজানে করুন এই ছয় আমল

মাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমান্বিত মাস। এ মাসেই নাজিল হয়েছে পবিত্র কোরআন। অসংখ্য ফজিলত ও বরকতে আল্লাহতায়ালা এ মাসকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ তাকওয়া অর্জনের পথে অগ্রসর হয় এবং আত্মশুদ্ধির অনন্য সুযোগ লাভ করে। রমজান শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; এটি আমল, ইবাদত, তওবা ও আত্মসংযমের এক সমন্বিত প্রশিক্ষণ। এই মাসকে যথার্থভাবে কাজে লাগাতে হলে কিছু বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া অপরিহার্য। এসব আমল একজন মোমিনের জীবনকে করে তোলে আলোকিত ও পরিশুদ্ধ।

রমজানের রোজা পালন : রমজান মাসে আল্লাহতায়ালা মোমিনদের ওপর রোজাকে ফরজ করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। হজরত সালমান ফারসি (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) শাবানের শেষ দিকের এক ভাষণে বলেন, ‘হে লোকজন! এক বরকতময় মাস তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। এ মাসে রয়েছে এমন এক রাত, যা হাজার মাস থেকে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহতায়ালা এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন।’ (তিরমিজি : ৬৮৩)।

রাতের ইবাদত তারাবি : তারাবি নামাজ নবীজি (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। আর জামাতের সঙ্গে বিশ রাকাত তারাবিহ খোলাফায়ে রাশেদা এবং সাহাবায়ে কেরামের সুন্নত। দ্বীনের বিষয়ে খোলাফায়ে রাশেদার অনুসরণ করা নবীজি (সা.) আমাদের ওপর আবশ্যক করে দিয়েছেন। হজরত ইরবাজ ইবনে সারিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার সুন্নত এবং খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নতের অনুসরণ করা তোমাদের ওপর আবশ্যক।’ (তিরমিজি : ২৬৭৬)। সর্বপ্রথম নবীজি (সা.) তারাবিহ নামাজ আদায় করেছেন। তবে তিনি ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে এই নামাজ আদায়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেননি। রমজান যেহেতু অধিক ইবাদতের মাস, এ জন্য তারাবিহ বিশ রাকাতের কম হওয়া উচিত নয়। আর উত্তম হলো তারাবিহতে অন্তত এক খতম কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করা।

শেষ রাতের তাহাজ্জুদ : আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার জন্য তাহাজ্জুদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমল। তাহাজ্জুদ আদায়কারী মোমিনদের আল্লাহতায়ালা ‘ইবাদুর রহমান’ তথা রহমানের বান্দা উপাধিতে ভূষিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘(তারা রহমানের বান্দা) যারা রাত অতিবাহিত করে মহান রবের সামনে সেজদাবনত ও দণ্ডায়মান অবস্থায়’ (সুরা ফুরকান : ৬৪)।

রাসুল (সা.) জীবনভর তাহাজ্জুদ নামাজের পাবন্দি করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম হলো রাতের (তাহাজ্জুদ) নামাজ।’ (মুসলিম : ২৬৪৫)।

কোরআন তেলাওয়া : রমজান হলো কোরআনের মাস। আল্লাহতায়ালা এ মাসে কোরআনুল কারিম অবতীর্ণ করেছেন। রমজান মাসের শ্রেষ্ঠত্ব মূলত এ কারণেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস, যে মাসে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং এমন নিদর্শনাবলি সম্পন্ন, যা সঠিক পথ দেখায় এবং (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। হজরত ওয়াসেলা ইবনে আসকা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সহিফা রমজানের প্রথম রাতে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর রমজানের ৬ তারিখে তাওরাত, ১৩ তারিখে ইনজিল, ১৮ তারিখে জাবুর এবং ২৪ তারিখে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে (তফসিরে তাবারি : ৩/১৮৯)। এ মাসে তাই বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত এবং কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।

শেষ দশকের ইতিকাফ : ইতিকাফ অর্থ অবস্থান করা। আল্লাহতায়ালার ইবাদত করার জন্য রমজানের শেষ দশকে মানুষজন থেকে পৃথক হয়ে মসজিদে অবস্থান করাকে পরিভাষায় ইতিকাফ বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময় রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘প্রত্যেক রমজানেই নবীজি (সা.) শেষ দশকের ইতিকাফ করতেন, তবে মৃত্যুপূর্ববর্তী রমজানে তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন।’ (বোখারি : ২০৪৪)। শেষ দশকের ইতিকাফ সুন্নতে মুআক্কাদায়ে কিফায়া। অর্থাৎ মসজিদের প্রতিবেশীদের কেউ একজন ইতিকাফ করলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে। তবে কেউ যদি ইতিকাফ না করে, তবে সবাই গুনাহগার হবে।

লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান : হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রাত লাইলাতুল কদর। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ’ (সুরা কদর: ০৪)। এ রাতের ইবাদত অনেক ফজিলতপূর্ণ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে পুণ্যলাভের প্রত্যাশায় লাইলাতুল কদরের ইবাদত করবে, তার পেছনের সব (ছগিরা) গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে’ (বোখারি : ২০১৪)। নবীজি (সা.) শেষ দশকের বিজোড় রাতে আমাদের লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে বলেছেন। রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। যে ব্যক্তি এই মাসে ইবাদতের প্রতি যত্নবান হয়, সেই প্রকৃত সফলতা অর্জন করে। জীবন ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু রমজানের আমল হতে পারে চিরস্থায়ী নাজাতের মাধ্যম। তাই আমাদের উচিত গাফিলতিতে সময় নষ্ট না করে আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সঙ্গে এই বিশেষ ছয়টি আমল পালনে সচেষ্ট হওয়া। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের বরকতপূর্ণ দিনগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগানোর তৌফিক দান করুন এবং এ মাসকে আমাদের জন্য নাজাতের সোপান বানিয়ে দিন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত