
প্রাথমিক পর্যায়ের ঝরে পড়া রোধ এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হওয়া ‘মিড-ডে মিল (স্কুল ফিডিং)’ কর্মসূচি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এখন এক আতঙ্কের নাম। গত কয়েকদিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলায় সরবরাহকৃত খাবার খেয়ে অন্তত দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এসব খাবারের তালিকায় ছিল বাসি পাউরুটি ও মানহীন ডিম।
এই ঘটনার জেরে জেলার দুটি উপজেলায় এরইমধ্যে কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রকল্পের শুরু থেকেই অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাব ফুটে উঠলেও সরবরাহকারী বেসরকারি সংস্থা ‘গাক (গ্রাম উন্নয়ন কর্ম)’ এসবের দায় পুরোপুরি নিতে নারাজ।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর নাচোল বাদে চারটি উপজেলায় এই কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। ৬১৮টি বিদ্যালয়ের এক লাখ ২১ হাজার ৪৪৫ জন শিক্ষার্থীকে পুষ্টিকর টিফিন দেওয়ার কথা থাকলেও উদ্বোধনের দিন থেকেই শুরু হয় অনিয়ম। প্রথম দিনে খাবারের তালিকায় দুধ ও বনরুটি দেওয়ার কথা থাকলেও শিশুদের শুধু দুধ খাইয়েই দায়িত্ব সারে এই প্রকল্পের খাবার সরকরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘গাক’। এরপর থেকেই খাবারের মান ও বণ্টন নিয়ে শুরু হয় নানা বিতর্ক।
গত ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরএলাকার শংকরবাটি ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮ শিক্ষার্থী পাউরুটি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ ঘটনার মাধ্যমে দিয়েই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের চিত্র সামনে আসে। ওই রাতেই সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ‘গাক’র গুদামে পচা ও মানহীন খাবারের মজুত পাওয়া যায়। এ অপরাধে ওই এনজিওর প্রতিনিধি মিজানুর রহমানকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা এবং গুদাম সিলগালা করা হয়। পাশাপাশি সদর উপজেলায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপরে ২৫ এপ্রিল শিবগঞ্জের চাতরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাউরুটি খেয়ে ২০ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় ২৬ এপ্রিল; গোমস্তাপুরের মকরমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে টিফিনের ডিম খাওয়ার পর শতাধিক শিক্ষার্থীর শরীরে একযোগে চুলকানি ও অ্যালার্জিজনিত বিষক্রিয়া দেখা দেয় বলে জানায় চিকিৎসকরা।
এ নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিভাকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সুমাইয়া খাতুনের অভিভাবক আব্দুল করিম বলেন, পুষ্টির কথা বলে আমাদের বাচ্চাদের বিষ খাওয়ানো হচ্ছে। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি চাই। আরেক অভিভাবক রাবেয়া খাতুন জানান, পচা ডিম খেয়ে তার মেয়ের সারা শরীর ফুলে লাল হয়ে গেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সময় থাকতে সংশ্লিষ্টদের আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব মুনিরুজ্জামান বলেন, সরকারি বিশাল বাজেটের এই প্রকল্পে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের উদাসীনতার সুযোগেই স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফার লোভে শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। যেখানে শিশুদের মেধাবিকাশের জন্য পুষ্টিকর খাবারের কথা ছিল, সেখানে বিষাক্ত খাবার সরবরাহ শুধু অনিয়ম নয় বরং একটি ফৌজদারি অপরাধও। দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত মিড-ডে মিল নিশ্চিত করতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরএলাকার শংকরবাটি ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা স্কুল ফিডিংয়ের পাউরুটি খেয়ে অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা। পরে ওইসব পাউরুটি জব্দ করা হয়। এরপরই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি নিম্নমানের পাউরুটি সরবরাহের প্রমাণ পেয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাউরুটিগুলো হাতে ধরলেই ঝুরঝুর করে ভেঙে যাচ্ছিল, যা বাসি খাবারের স্পষ্ট লক্ষণ। এই প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতথ্য নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিজেই। এদিকে, বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘গাক’ পরিস্থিতির পুরোপুরি দায়ভার নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে।