
আকাশে কালো মেঘ জমলেই সেনোয়ারা বেগমের বুক ধড়ফড় করতে শুরু করে। বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখ চলে যায় ঘরের পাশের খাড়া পাহাড়ের দিকে। বাঁশ, দড়ি ও ত্রিপলে তৈরি ছোট্ট আশ্রয়টি পাহাড়ের ঢালের নিচে। দিনের আলোয় পাহাড়টিকে যতটা নিরীহ মনে হয়, টানা বর্ষণে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর পরিবারের সবচেয়ে বড় ভয়।
উখিয়ার ক্যাম্প-২০-এর বাসিন্দা সেনোয়ারা জানেন, পাহাড়ধস কতটা নির্মম হতে পারে। গত কয়েক বছরে এমন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু রোহিঙ্গা। তাই বর্ষা তাঁর কাছে ঋতু পরিবর্তনের আনন্দ নয়; অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা আর নির্ঘুম রাতের প্রতিশব্দ।
তিনি বলেন, কাছাকাছি নিরাপদ কোনো জায়গা নেই। অন্যত্র যেতে বলা হয়, কিন্তু সেখানে গেলে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হয়। পাহাড়ের ঢালগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যেত।
সেনোয়ারার গল্প একার নয়। উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা শিবিরে হাজারো পরিবার একই শঙ্কা নিয়ে বর্ষা পার করে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতিগুলোর একটিতে জায়গার তীব্র সংকটের কারণে বহু পরিবারকে খাড়া পাহাড়ের ঢাল কিংবা তার নিচেই আশ্রয় নিতে হয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লাখো রোহিঙ্গার জন্য বনভূমি কেটে গড়ে তোলা হয় এসব শিবির। এতে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্ষার ভারী বৃষ্টিতে আলগা হয়ে যায় মাটি, তৈরি হয় ফাটল, আর মুহূর্তেই ধসে পড়তে পারে পুরো একটি পাহাড়ি ঢাল।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানায়, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধসে ২৮ জন নিহত এবং অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই মারা গেছেন ১২ জন, যা ওই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই প্রাণ গেছে আরও দুইজনের, আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের জনযোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল এখনো স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়নি। ফলে শুধু শরণার্থী পরিবার নয়, ক্যাম্পের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও বর্ষাকালে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাড়া ঢাল, বন উজাড়, দুর্বল মাটি, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত জনঘনত্ব—ভূমিধসের প্রায় সব কারণই রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বিদ্যমান।
এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার সংকট। ইউএনএইচসিআর বলছে, অর্থের অভাবে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়কেন্দ্র শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম আগের তুলনায় সীমিত হয়ে গেছে। খাদ্য, পুষ্টি ও সুরক্ষার মতো জরুরি খাতে অর্থ বরাদ্দ দিতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ-ঝুঁকি হ্রাসের অনেক উদ্যোগ কমিয়ে আনতে হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে সেটি সহজ নয়। শারি নিজমান বলেন, শিবিরে খালি জমি নেই বললেই চলে। আবার অনেক পরিবার জীবিকা, বাজারে যাতায়াত ও দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক হারানোর আশঙ্কায় স্থানান্তরে রাজি হয় না।
ক্যাম্প-৪-এর বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, “বৃষ্টি শুরু হলেই ঘুম আসে না। সারারাত ভাবি, কখন পাহাড় ভেঙে পড়বে। সন্তানদের নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়।”
বর্ষা সামনে রেখে প্রতিটি শিবিরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে জেলায় প্রায় ২৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সহকারী আবহাওয়াবিদ এ বি হান্নান জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে, যা নতুন করে ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, উন্নত ড্রেনেজ, জিওটেক্সটাইল ব্যবহার এবং ভেটিভার ঘাস রোপণের মতো প্রকৌশলভিত্তিক উদ্যোগ চলমান রয়েছে। তবে সংস্থাটির সতর্কবার্তা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া প্রতি বর্ষাতেই একই সংকট ফিরে আসবে।
এদিকে ২০১৭ সালের পরও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ পুরোপুরি থামেনি। গত দেড় বছরে আরও প্রায় দেড় লাখ মানুষ মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। অথচ রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের অর্থায়ন ধারাবাহিকভাবে কমছে। চলতি বছরের তহবিল আহ্বান আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম। শারি নিজমান বলেন, সহায়তা কমে যাওয়ায় শিবিরের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। দ্রুত প্রত্যাবাসনেরও কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। তাই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট মোকাবিলায় নতুন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
গত বছর আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির প্রায় অর্ধেক বাস্তবে পাওয়া গেছে। ফলে খাদ্য সহায়তাও সংকুচিত হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমান বরাদ্দ একজন মানুষের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদাও পূরণ করছে না। এতে মানবিক সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে।
বর্ষা তাই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে কেবল একটি ঋতু নয়; এটি হাজারো মানুষের কাছে টিকে থাকার পরীক্ষা। বৃষ্টি নামলে তারা আকাশের দিকে নয়, তাকিয়ে থাকে পাহাড়ের দিকে- কখন মাটি সরে যায়, কখন ভেঙে পড়ে ঢাল, আর কখন নতুন করে শুরু হয় আরেকটি ট্র্যাজেডি।