
কুষ্টিয়ায় পদ্মা ও গড়াইয়ের ২৮টি পয়েন্টে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ২১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি বসতবাড়ি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে ভাঙনরোধে এরইমধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরইমধ্যে কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী উপজেলা দৌলতপুরের মরিচা ইউনিয়নের ভোরকাপাড়া, হাটখোলা এলাকায় পদ্মা নদীতেপানি বৃদ্ধিতে আগ্রাসী রূপ নেওয়া পদ্মায় একের পর এক ভাঙছে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি।
ভুক্তভোগী এলাকার বাসিন্দা আজিম শেখ জানান, আমাদের গ্রামের ফসলি জমি নদীতে ভেঙে চলে গেছে। ১০-১২ দিনের ভেতরে কয়েকশ বিঘা জমি ভেঙে নদীতে চলে গেছে। আমরা ফসল আবাদ করেছিলাম পাট সেটাও নদীতে চলে গেছে। আমরা এখন নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমরা এখন খাব কি চলব কিভাবে সেটা নিয়ে চিন্তায় আছি। এখন আমাদের যে ভিটে মাটি টুকু আছে সেটুকু বাঁচে তাহলে আমরা রক্ষা পাবো। আমাদের মাথার গোজার ঠাঁয় থাকবে।
আরেক ভুক্তভোগী বাসিন্দা বলেন, আমার এই জায়গা থেকে নদী ৯ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ছিল। ১০ বছরের মধ্যে আমাদের গ্রামের কাছে নদী এসে গেছে। যেখানে আমাদের মরিচা এলাকায় ২০ হাজার ভোটার। তাহলে লোক কত হতে পারে বুঝতেই পারছেন। আমি সরকারের কাছে দাবি করছি আমাদের এখানে যদি একটা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে দেয়া যেত তাহলে আমরা বাঁচতাম।
এদিকে ভেড়ামারা উপজেলার ফয়জুল্লাপুর, মসলেমপুর, টিকটিকিপাড়া ও মুন্সিপাড়া এলাকায়ও তীব্র ভাঙনে ভাঙছে কৃষকের স্বপ্ন। পদ্মার তীব্র ¯্রােতে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে বিপুল ফসলি জমি।
ভুক্তভোগী কৃষক ছলিম শেখ বলেন, আমাদের এলাকায় নদীর ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। আমরা যা চাষাবাদ করেছি তা নদীতে চলে গেছে। আমি প্রায় ৮ বিঘা জমি চাষ করেছিলাম। তা নদীতে চলে গেছে। শুধু আমার না আরও অনেকের জমি চলে গেছে। কিছু দূরেই আমাদের বাড়ি-ঘড়। এভাবে নদী ভাঙতে থাকলে সেটাও চলে যাবে।
অপরদিকে, আগ্রাসী পদ্মার প্রধান শাখা গড়াইও অশান্ত হয়ে উঠেছে। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে হুমকীর মুখে পড়েছে শহরের কোল ঘেঁষা কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াই ঘাট এলাকার অস্থায়ী বাঁধও ধসে গেছে প্রায় ৫০ মিটার। তবে ভাঙ্গন শুরুর পরই পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা শুরু করেছে।
ভুক্তভোগী আকলিমা খাতুন বলেন, আমাদের এই দিকে দুই পাশে দুইটা নদী পদ্মা এবং গড়াই। আমরা এখন আতঙ্কে আছি। নদীতে ভাঙ্গন ধরেছে। পাশেই আমাদের বাড়ি। যেকোনো মুহূর্তেই আমাদের বিপদ ঘটতে পারে। আমাদের এদিকে চেয়ারম্যান মেম্বাররা আছেন আমাদের খেয়াল রাখে তাহলে কিন্তু আর আমাদের এই অবস্থা থাকে না। এখন যে রকম ভাবে ব্যাগ ফেলছে এগুলো যদি আগে থেকে করতো তাহলে আর এরকম ভাবে নদী ভাঙতো না।
এদিকে, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিয়ে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসন সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, আমার আসনে চারটা ইউনিয়ন চর এলাকা। এগুলোর মধ্যে মরিচা ইউনিয়নের কোলদিয়ার, হাটখোলাপাড়া, চিলমারী এলাকায় চরম ভাঙন হচ্ছে। এই ভাঙনের ব্যাপারে আমি পার্লামেন্টে দুই দিন কথা বলেছি। মাননীয় মন্ত্রীর কাছে কয়েকবার গেছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডেও কথা বলেছি। জিও ব্যাগ ফেলার জন্য আমি বারবার তাদের অনুরোধ করেছি। ডিও লেটার দিয়েছি।
তিনি বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজন ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা। কিন্তু সে জায়গায় মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বরাদ্দ দিয়েছেন মাত্র ২ কোটি টাকা। ভাঙন এলাকায় অলরেডি ২ কোটি টাকার জিও ব্যাগ ফেলা হয়ে গেছে। প্রয়োজনের চেয়ে বরাদ্দ অনেক কম হওয়ায় আমি আবারও মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করেছি তার অফিসে। তাকে জানিয়েছি সেখানে আরও টাকা বরাদ্দ দেওয়া লাগবে। আমি যতদূর জানি এই কয়দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ বিঘা জমি ভাঙনে পদ্মা গর্ভে চলে গেছে। টাকা আরও বরাদ্দ না দিলে আমার এই কোলদিয়ার গ্রামের দুইটা ওয়ার্ড থাকবে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, পদ্মা ও গড়াই নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে জেলার ২৮টি পয়েন্টে প্রায় ২১ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। তবে ভাঙন প্রতিরোধে এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফেলা হচ্ছে জিও ব্যাগ ও টিউব।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, কুষ্টিয়াতে বড় দুইটা নদী আছে। একটি গড়াই আর আরেকটি পদ্মা। সাম্প্রতিক সময়ে মৌসুমী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে পানি নেমে আসার কারণে পদ্মা নদী ও গড়াই নদীতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের যে জায়গাগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এরকম ২৮টি পয়েন্ট বা ২১ কিলোমিটার চিহ্নিত করেছি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন জায়গায় বেসিক ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে সে জায়গাগুলোতে আমরা জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।