
নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল ঘরবাড়ি। স্বামীকে হারানোর পর দুই মেয়েকে নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছিলেন ৮৫ বছর বয়সী রাবেয়া বেগম। ২০০৩ সালে পটুয়াখালী সদর উপজেলার পশ্চিম কালিকাপুর আবাসন প্রকল্পে একটি ঘর পান তিনি। নতুন ঘর পেয়ে স্বস্তি ফিরেছিল তার জীবনে। মনে হয়েছিল, এবার বুঝি জীবনের শেষ সময়টুকু নিরাপদে কাটাতে পারবেন। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে। আবাসন প্রকল্পের ঘরের টিনে ধরেছে মরিচা, কোথাও কোথাও হয়েছে ছিদ্র। বৃষ্টি নামলেই চালা দিয়ে পানি পড়ে ঘরের ভেতর। পানি ঠেকাতে কখনো পলিথিন, কখনও প্লাস্টিকের চট বিছিয়ে রাখতে হয়। কোথাও আবার ছিদ্রের ওপর ইট চাপিয়ে রাখা হয়েছে। দরজা-জানালাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে যে ঘরটি একসময় ছিল নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীক, সেটিই এখন রাবেয়া বেগমের কাছে হয়ে উঠেছে দুর্ভোগের কারণ।
রাবেয়া বেগম বলেন, বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। টিন দিয়ে পানি আটকানো যায় না। অনেক কষ্ট করে এখানে থাকি। সরকার যদি ঘরটা মেরামত করে দিত, তাহলে বাকি জীবনটা একটু শান্তিতে থাকতে পারতাম। রাবেয়ার মতো একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন জেলার বিভিন্ন আবাসন ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় অনেক প্রকল্পের ঘর এখন জরাজীর্ণ। কোথাও টিনের চালা নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও দেয়াল ও দরজা-জানালা ক্ষতিগ্রস্ত। আবার অনেক প্রকল্পে শৌচাগার, গোসলখানা ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যবহার উপযোগী নেই বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। সরেজমিন জেলার বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ টিনের ব্যারাকের অবস্থাই নাজুক। পুরোনো টিনে মরিচা পড়ে অনেক জায়গায় ছিদ্র হয়েছে। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে বাসিন্দারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পলিথিন, প্লাস্টিকের চট কিংবা পুরোনো টিন দিয়ে চালা ঢাকার চেষ্টা করছেন। কোথাও ছিদ্রের ওপর ইট চাপিয়ে রাখা হয়েছে।
তবে এসব অস্থায়ী ব্যবস্থা বৃষ্টি ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট নয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। মেঝেতে পানি জমে যায়। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় বাসিন্দাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার কাঁকড়াবুনিয়া ইউনিয়নের কাঁকড়াবুনিয়া বাজারসংলগ্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প ও ভিকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্প ১৯৯৯ সালে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত হয়। এরপর ২০০৯ সালে মসজিদবাড়িয়া ইউনিয়নের তারাবুনিয়া ও ভাসন্ডা, দেউলী, কপালভেড়া এবং রামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পগুলোতে মসজিদ, কবরস্থান, সমবায় সমিতির কার্যালয়সহ টিনের ব্যারাক নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রতিটি ব্যারাকে রয়েছে ১০টি করে কক্ষ। আবাসিক জমিসহ ভূমিহীন পরিবারকে একটি করে কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১০টি পরিবারের জন্য ছিল চারটি শৌচাগার ও দুটি গোসলখানা। প্রতিটি ব্যারাকের জন্য স্থাপন করা হয়েছিল একটি করে গভীর নলকূপ। প্রকল্পগুলো নির্মাণের সময় ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের জন্য এগুলো ছিল বড় ধরনের আশার জায়গা। কিন্তু নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এখন অনেক প্রকল্পের অবকাঠামো নষ্ট হয়ে পড়েছে। সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ভূমিহীন, গৃহহীন ও অসহায় পরিবারকে একটি নিরাপদ আবাসন দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রকল্পের ঘরগুলোর স্বাভাবিক ক্ষয় হয়েছে। উপকূলীয় জেলা হওয়ায় লবণাক্ততা, বৃষ্টি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবেও টিনের ঘর দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান। বাসিন্দারা বলছেন, নিজেদের সীমিত আয় দিয়ে নিয়মিত ঘর মেরামত করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে সরকারি সংস্কারের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে তাদের। পশ্চিম কালিকাপুর আবাসন প্রকল্পের আলমগীর নামে এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের অনেকেরই নিজের জমি বা বাড়ি নেই। এই ঘরটাই আমাদের সব। কিন্তু ঘর যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? সরকার আমাদের থাকার জন্য ঘর দিয়েছে, এখন ঘরটা মেরামত করে দিলে আমরা উপকার পেতাম। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলায় মোট ৭৪টি আবাসন প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে ভূমিহীন ও অসহায় পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পগুলোর অনেক ঘর দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও টিনের চালা নষ্ট, কোথাও দরজা-জানালা ভাঙা। অনেক জায়গায় পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ফলে সরকারি উদ্যোগে আবাসন পেলেও প্রকল্পের অবকাঠামো টেকসইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় অনেক পরিবার আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
আবাসন প্রকল্পগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি ও সংস্কারের বিষয়ে জানতে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন, আবাসন প্রকল্পগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, আবাসন প্রকল্পগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোথায় কী সমস্যা রয়েছে, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খুব শিগগিরই সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।