
পটুয়াখালী শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে পায়রাকুঞ্জ এলাকায় নির্মাণাধীন সেতুটির কাজ বছরের পর বছর ধরে থমকে আছে। নির্মাণস্থলে পড়ে থাকা যন্ত্রপাতিতে ধরেছে মরিচা। অর্ধনির্মিত অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই। সেতুর অপেক্ষায় দিন গুনছেন নদীর দুই পাড়ের মানুষ। ২০২০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সেতু নির্মাণ শেষ হয়নি। বরং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর শুরু হয়নি। বর্তমানে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ২৬ শতাংশ।
পায়রা নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণ হলে পটুয়াখালী থেকে পিরোজপুর হয়ে খুলনা ও মোংলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। এতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও কমে আসত। বিশেষ করে মির্জাগঞ্জ, সুবিদখালী, পটুয়াখালী সদরসহ আশপাশের এলাকার কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যেতে পারতেন।
কিন্তু সেতু না থাকায় এখনো নদী পারাপারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।
সুবিদখালীর কৃষক সামসু মিয়া বলেন, পাইলিংয়ের যন্ত্রপাতি আসার পর তিনি আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। তার ভাষায়, যেদিন পাইলিংয়ের যন্ত্রপাতি এসেছিল, সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, হয়তো আমাদের দুর্ভোগের দিন শেষ হতে চলেছে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগের দুর্ভোগই এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, নদী পারাপারের কারণে উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। অনেক সময় পণ্য দ্রুত বাজারে নিতে না পারায় ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে হয়।
শচীন দাস নামে মির্জাগঞ্জের এক কৃষক বলেন, সেতু থাকলে আমাদের পণ্য সরাসরি বাজারে নিতে পারতাম। এখন নদী পার হতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। কৃষকদের ভাষ্য, সেতুটি চালু হলে পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসত।
উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়া যেত এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও পরিবহন ব্যয়ের চাপও কিছুটা কমত। অন্যদিকে সেতু না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নদীর দুই পাড়ের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। প্রতিদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোচিং কিংবা পরীক্ষায় অংশ নিতে নদী পার হতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে। নৌযানের সময়সূচি অনিয়মিত হওয়ায় অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। বর্ষা কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলেন, প্রতিদিন নদী পার হয়ে স্কুল-কলেজে যেতে হয়। নৌযান পেতে দেরি হলে ক্লাস বা পরীক্ষা মিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেতুটি হলে আমাদের যাতায়াত অনেক সহজ হতো।
স্থানীয়দের কাছে সেতুটি শুধু যোগাযোগের অবকাঠামো নয়, এটি জরুরি চিকিৎসার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত একটি বিষয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে বরিশাল কিংবা ঢাকায় নিতে হলে প্রথমেই নদী পার হওয়ার চিন্তা করতে হয় স্বজনদের। ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। আবার জরুরি পরিস্থিতিতে স্পিডবোট কিংবা অন্য নৌযান নিতে গেলে গুনতে হয় বাড়তি টাকা।
ফেরিঘাটের ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে বরিশাল বা ঢাকায় নিতে হলে আমাদের ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আর অপেক্ষা করার সুযোগ না থাকলে বেশি টাকা দিয়ে অন্য নৌযানে যেতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জরুরি রোগী নিয়ে নদীর পাড়ে এসে কখন ফেরি বা অন্য নৌযান পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী ফেরি দিনে তিনবার চলার কথা থাকলেও বাস্তবে এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফেরির যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অন্যদকে ট্রলারে নদী পার হতে জনপ্রতি প্রায় ২০ টাকা লাগে। তবে রাতের বেলা কিংবা আবহাওয়া খারাপ থাকলে ভাড়া বেড়ে যায়। স্পিডবোটে নদী পার হতে খরচ হয় ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। নদীর পানি উত্তাল থাকলে ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
মাঠপর্যায়ে প্রকল্পটির কাজ থেমে থাকার চিত্র স্পষ্ট। এখন পর্যন্ত রয়েছে ১০ দশমিক ৪ একর অধিগ্রহণ করা জমি, তিনতলা টোল ও অফিস ভবন, একটি অস্থায়ী অফিস এবং নির্মাণ ইয়ার্ড। এ ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে ছয়টি টেস্ট পাইল, ৬০টি সার্ভিস পাইল, ছয়টি পাইল ক্যাপ এবং তিনটি পিয়ার কলাম। কিন্তু এরপর আর এগোয়নি কাজ। নির্মাণস্থলে পড়ে থাকা যন্ত্রপাতিগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মরিচা ধরে নষ্ট হওয়ার পথে। কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী এসব স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি পাহারা দিচ্ছেন।
২০১২ সালে সেতুটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রাথমিক নকশা সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু এরপর ওই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা, মাটির প্রকৃতি, জলবায়ু, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নতুন করে নকশা তৈরির প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রকল্পটি ডিজাইন-বিল্ড মডেলে বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল। মূল সমীক্ষা ও দরপত্রের নথিতে থাকা ঘাটতির কারণে ঠিকাদার ও পরামর্শকের মধ্যে নকশা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। এর ফলে অনুমোদন প্রক্রিয়াও দীর্ঘায়িত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে প্রথম বড় বাধা আসে করোনা মহামারির সময়। মহামারির কারণে দরপত্র ও ঠিকাদার নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রায় নয় মাস পিছিয়ে যায়। এরপর দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে প্রকল্পটি 'ক্যাটাগরি-সি' হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা হয়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও প্রায় দেড় বছর পিছিয়ে যায়। এরপর সামনে আসে নতুন নকশার বিষয়টি। নকশা পরিবর্তনে চলে যায় আরও ১৮ মাস
২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত সংশোধিত চুক্তিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সড়কের বাঁক আরও মসৃণ করা, মূল সেতুর স্প্যানের দৈর্ঘ্য বাড়ানো এবং আবাসিক ভবন থেকে আলাদা করে টোল মনিটরিং সুবিধা তৈরির কথা বলা হয়।নতুন এসব শর্ত পূরণ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আক্তার গ্রুপ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামহোওয়ান করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগকে নতুন করে সেতুর নকশা তৈরি করতে হয়। এতেও চলে যায় আরও প্রায় ১৮ মাস। বর্তমানে নকশার চূড়ান্ত অনুমোদন না হওয়ায় নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা যাচ্ছে না। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, পরামর্শকের পক্ষ থেকে বারবার কারিগরি নির্দেশনা পরিবর্তনের কারণেই নকশা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. তোফাজ্জল হোসেনের দাবি, প্রকল্পের কাজ থেমে থাকার মূল কারণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থসংকট। তিনি বলেন, সাইটে থাকার কথা থাকা পরামর্শকরাও সেখানে উঠতে পারছেন না। কারণ ঠিকাদার অর্থ পরিশোধ না করায় পরামর্শকদের জন্য নির্ধারিত ভবনের তৃতীয় তলা এখনো অসম্পূর্ণ ও আসবাবহীন। নকশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা বারবার ত্রুটিপূর্ণ নকশা জমা দিচ্ছে। যাতে নকশা চূড়ান্ত অনুমোদন না পায় এবং তাদের কাজও করতে না হয়। এটাই মূল কারণ। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ঠিকাদারি চুক্তি বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে এতে নতুন করে সময় ও অর্থ-দুটিই ব্যয় হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।তবে প্রকল্প পরিচালকের অভিযোগ নাকচ করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মীর আক্তার গ্রুপের প্রজেক্ট ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার ফারহান খান চৌধুরী । তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ পিছিয়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মূল সমস্যা নকশা নিয়ে। নকশা এখন 'আংশিক অনুমোদিত' হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের কাজের পরিধি বাড়ায় অতিরিক্ত ব্যয় বা 'কস্ট ভ্যারিয়েশন' নিয়েও এখনো সমাধান হয়নি। পরামর্শকের কারিগরি নির্দেশনার বিষয়ে তিনি বলেন, তারা আমাদের বারবার বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়েছে।
তবে তিনি আশাবাদী নকশা চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে কাজ আবার শুরু হবে এবং কাজ অনুযায়ী সরকারও অর্থ পরিশোধ করবে। এক হাজার ৪২ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বছরের পর বছর কেটে গেলেও পায়রা নদীর ওপর এখনো দাঁড়ায়নি প্রতিশ্রুত সেতু।
অথচ নদীর দুই পাড়ের মানুষের প্রয়োজন দিন দিন বাড়ছে। কৃষক চান দ্রুত ও কম খরচে পণ্য বাজারজাত করতে। শিক্ষার্থীরা চান নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত। রোগীর স্বজনরা চান জরুরি মুহূর্তে সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে পৌঁছাতে। স্থানীয়দের কাছে সেতুটি এখন আর শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, শিক্ষা ও চিকিৎসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রয়োজন। তাদের প্রত্যাশা- নকশা, অর্থসংকট কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা, যে সমস্যাই থাকুক না কেন, দ্রুত তার সমাধান করে আবার শুরু করা হোক নির্মাণকাজ।