
মা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না- এই সত্যটি বোঝার বয়স এখনও হয়নি অর্পিতা ও অহনার। তাই হয়তো মায়ের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে তারা। ঘরের দরজায়, মায়ের ছবির দিকে কিংবা পরিচিত কোনো জিনিসে খোঁজে সেই প্রিয় মুখ। কিন্তু তাদের এই অপেক্ষার আর কোনোদিন শেষ হবে না। কারণ, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মা তিথী রানী। তিথী শুধু দুই সন্তানের মা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি পরিবারের স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিথী রানী, শিল্পী রানীসহ চারজনের মৃত্যু হয়। একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছে চারটি প্রাণ। তবে তিথীর মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বিলবিলাস গ্রামের পরিবারটি।
স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে হারিয়ে এখন দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা কাঠমিস্ত্রি রনজিৎ মিস্ত্রি। বিলবিলাস গ্রামের বাড়িটিতে এখনও তিথীর স্মৃতি। ঘরের প্রতিটি কোণে যেন ছড়িয়ে আছে তার উপস্থিতি। নেই শুধু মানুষটি। ছোট্ট অর্পিতা ও অহনার কাছে মা ছিলেন তাদের সবচেয়ে আপন মানুষ। মায়ের আদর, শাসন আর ভালোবাসাতেই কাটত তাদের দিন। এখন সেই মায়ের জায়গায় শুধুই শূন্যতা।
রনজিৎ বলেন, স্ত্রীকে হারানোর কষ্ট তো আছেই। কিন্তু বাচ্চা দুটোর দিকে তাকালে আরও বেশি কষ্ট হয়। ওরা তো মাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। কীভাবে ওদের মানুষ করব, কীভাবে পড়াশোনা করাব- কিছুই বুঝতে পারছি না। তিনি বলেন, আমি কাঠমিস্ত্রির কাজ করি। একা মানুষ, দুইটা বাচ্চা। সংসার চালানোই কষ্টের। এখন ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তায় আছি। তিথীর মৃত্যুর পর পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, রনজিৎ একজন শ্রমজীবী মানুষ। তার একার আয়ে দুই সন্তানকে বড় করা কঠিন। স্থানীয় বাসিন্দা পলাশ বলেন, তিথীর মৃত্যুতে পরিবারটি একেবারে ভেঙে পড়েছে। দুইটা ছোট বাচ্চা মাকে হারিয়েছে। তাদের বাবা একা কীভাবে সংসার চালাবেন, সেটাও বড় চিন্তার বিষয়। আমরা চাই সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এবং প্রশাসন পরিবারটির পাশে দাঁড়াক।
প্রতিবেশী সুমন বলেন, তিথী খুব ভালোভাবে সংসার করত। সন্তান দুটাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। আজ সে নেই। বাচ্চা দুটোর দিকে তাকালে খুব কষ্ট লাগে। তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সমীর মিস্ত্রী বলেন, দুর্ঘটনা তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু এই পরিবারটাকে যদি আমরা সবাই মিলে সহযোগিতা করি, তাহলে অন্তত বাচ্চা দুটির ভবিষ্যৎটা কিছুটা নিরাপদ করা সম্ভব। সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না, এর সঙ্গে ভেঙে পড়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। তিথীর ক্ষেত্রেও ঘটেছে তাই।
তার মৃত্যুতে দুই সন্তান হারিয়েছে মায়ের ছায়া। স্বামী হারিয়েছেন জীবনসঙ্গীকে। আর পৃথিবীর আলো দেখার আগেই হারিয়ে গেছে তিথীর অনাগত সন্তান। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই তিথী ও শিল্পী রানীসহ চারজনের মৃত্যু আবারও সামনে এনেছে পটুয়াখালীর সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্ন। পটুয়াখালীর বিভিন্ন সড়কে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকদের অসতর্কতা এবং কোথাও কোথাও সড়কের অব্যবস্থাপনার কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় নয় মাসে পটুয়াখালীতে দেড় শতাধিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ জন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৮টি।
পটুয়াখালী সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকদের অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি ও নিয়ম না মানার বিষয়গুলো আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখি। দুর্ঘটনার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি সড়কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশ নিয়মিতভাবে কাজ করছে। দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তিথীর মৃত্যু কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তার রেখে যাওয়া দুই সন্তান অর্পিতা ও অহনার ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়ে এখন সেটিই পরিবারের সবচেয়ে বড় চাওয়া। রনজিৎ মিস্ত্রির একার পক্ষে দুই সন্তানকে মানুষ করা কঠিন। তাদের পড়াশোনা, খাবার, চিকিৎসা, পোশাকসহ দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হবে তাকে। বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সালেহ আহমেদ জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অসহায় পরিবারটিকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।