ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ধূমপানের মরণফাঁদ ও আমাদের করণীয়

ধূমপানের মরণফাঁদ ও আমাদের করণীয়

বর্তমান বিশ্বে জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকির নাম তামাক তথা ধূমপান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ধূমপান শীর্ষে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, বরং একটি সামাজিক ও জাতীয় অভিশাপ। তামাকের ধোঁয়ায় মিশে থাকে বিষাক্ত নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড এবং প্রায় ৭০টিরও বেশি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান (Carcinogens)। প্রতিটি টানে একজন ধূমপায়ী নিজের অজান্তেই তার আয়ু কমিয়ে দিচ্ছেন এবং ঠেলে দিচ্ছেন নিজেকে এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে।

ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। এর ভয়াবহতা বর্ণনা করে শেষ করা কঠিন। মরণব্যাধি ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রধান কারণ ধূমপান। এছাড়াও মুখগহ্বর, গলা, খাদ্যনালী, পাকস্থলী এবং মূত্রথলির ক্যান্সারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় তামাক সেবন। ধূমপান রক্তনালীকে সংকীর্ণ করে দেয় এবং রক্তচাপ বাড়ায়। ফলে হৃদরোগ (Heart Attack) ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়। ধূমপায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ যেমন ব্রঙ্কাইটিস ও এমফিসেমা (COPD)-তে ভোগেন, যা জীবনের শেষ সময়গুলোকে অসহনীয় করে তোলে।

পরোক্ষ ধূমপানের বিপদ ও ভয়াবহতার সত্য এই যে, ধূমপায়ীর পাশে থাকা অধূমপায়ী ব্যক্তিটিও সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য পরোক্ষ ধূমপান (Second-hand smoking) অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি শিশুদের নিউমোনিয়া, অ্যাজমা এবং হঠাৎ মৃত্যুর (SIDS) কারণ হতে পারে। ধূমপান শুধু শারীরিক ক্ষতিই করে না, এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা। একজন নিম্নবিত্ত মানুষ তার আয়ের একটি বড় অংশ তামাক কিনতে ব্যয় করেন। পরবর্তীতে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার পেছনে পরিবারটিকে নিঃস্ব করে ফেলেন। জাতীয়ভাবেও তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায় যে অর্থ ব্যয় হয়, তা তামাক খাত থেকে আসা রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি। এটি একটি উৎপাদনশীল সমাজ গঠনের অন্তরায়। ধূমপানমুক্ত সমাজ গঠন করা কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক সমন্বিত প্রচেষ্টা।

জনসমাগমস্থলে ধূমপান নিষিদ্ধ করার আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তামাকজাত পণ্যের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ করতে হবে যাতে এটি সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে তামাক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধূমপানের ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে। সিগারেটের প্যাকেটে যে সচিত্র সতর্কবাণী থাকে, তার কার্যকারিতা আরও বাড়াতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সন্তানদের সামনে বড়দের ধূমপান করা বন্ধ করতে হবে। পরিবারই হতে হবে সচেতনতার প্রথম ধাপ। পাড়া-মহল্লায় ধূমপান বিরোধী ক্লাব বা সংগঠন গড়ে তুলে তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। যারা ধূমপান ত্যাগ করতে চান, তাদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (NRT) এবং সরকারি হাসপাতালে ‘স্মোকিং সেশন’ ক্লিনিক চালু করা প্রয়োজন।

ধূমপান কোনো আভিজাত্যের প্রতীক নয়, বরং এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। একটি সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে ধূমপানের কোনো স্থান নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি বিষমুক্ত পৃথিবী উপহার দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সরকার, সুশীল সমাজ এবং সচেতন নাগরিক- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়া সম্ভব। মনে রাখতে হবে, আপনার ত্যাগের একটি সিগারেট আপনার পরিবারকে দিতে পারে হাসিমাখা দীর্ঘ জীবন। আসুন, আজই ধূমপানকে ‘না’ বলি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত