প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ জানুয়ারি, ২০২৬
প্রাণদ ও প্রীতিপদ ব্যবহারের মূলে থাকে মানুষের চরিত্র। যারা সৎ ও বিনয়ী তাদের সব সময় লক্ষ্য থাকে কীভাবে তারা অপরকে সৎভাবে সুখী ও সন্দীপ্ত করে তুলবে। এই আকৃতিই তাদের ব্যবহারের মধ্যে একটা গভীর আন্তরিকতা সঞ্চারিত করে। এবং তা মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করেই। তাদের মধ্যে ভদ্রতার বাড়াবাড়ি বা সৌজন্যের অহংকার থাকে না। অপরের সান্নিধ্যে তারা নিজেরাও সুখী হয় এবং অপরকেও সুখী করে তোলে। তাদের ব্যবহারের মধ্যে থাকে একটা সহজ স্বাচ্ছন্দ্য। তাই মানুষ লহমায় তাদের আপন হয়ে ওঠে। তাদের প্রাণখোলা ব্যবহার মানুষের মনে দাগ কেটে যায়। যারা মান-হুঁশ তাদের পক্ষেই এমনতর ব্যবহার আয়ত্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠে। আদর্শানুরাগ ও সেবা-বুদ্ধি থাকলে প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য-অনুযায়ী এই রকমটা গজিয়ে ওঠে। ভিতরে যদি প্রীতি ও সেবা-বুদ্ধি না থাকে তাহ’লে মানুষ যতই অন্তরঙ্গতার ভান করুক, না কেন তা কিন্তু মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে না। নিজের প্রাণ যদি না জাগে তবে অপরের প্রাণকে স্পর্শ করা যায় না। লেখা পড়ায় দর হলে শিক্ষা তারে কয় না, অভ্যাস ব্যবহার সহজ জ্ঞান নইলে শিক্ষা হয় না। চলা বলাই বলে দেয় কেমন মানুষ কি-বা চায়। একজন মানুষের অভ্যাস ও ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝা যায় মানুষটি কেমন।
জীবন চলার পথে সদ্অভ্যাস এবং সদ্ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে দিয়ে নিজেকে অন্যদের মাঝে ভালোসার পাত্র হিসেবে গড়ে তোলা যায় এবং মনুষ্যজীবন মহিমান্বিত হয়ে উঠে। পরস্পর পরস্পরের সহযোগী হয়ে উঠলে জীবন তখন ভোগের না হয়ে উপভোগের হয়ে উঠে। আমাদের পথপরিক্রমায় খেয়াল রাখি, একটা নতুন দিন, একটা নতুন শুরু। সেই দিনটা পাওয়ার জন্যই ধন্যবাদ জানিয়ে কাজ শুরু করতে পারি। হাসিমুখে অন্য মানুষকে ‘শুভ দিন’ বলায় একটি ইতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে যায়। সেই মানুষটির মুখেও হাসি ফোটে। যে সমস্ত মানুষ দিনরাত নেতিবাচক কথা বলেন, একই প্রসঙ্গ বার বার উত্থাপন করেন তাদের সংস্পর্শে থাকলে মন কিন্তু ভালো থাকে না। কেউ মানসিক কষ্ট বা অবসাদে থাকলে তাকে এড়িয়ে চলা ঠিক নয়। বরং যতটা সম্ভব সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু স্বভাবগত ভাবে কেউ এমন হলে, সেই পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া ভালো।
ইতিবাচক কথা যেমন অনুপ্রেরণা জোগায়, তেমনই ক্রমাগত নেতিবাচক কথা মনকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে। কোনোকিছুর প্রত্যাশারহিত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিসরে আমরা যদি অপরের সহযোগী ও সহমর্মি হয়ে উঠি তার আবেশে চারদিকে এক আনন্দময় পরিবেশ তৈরি হয় এবং যার বিস্তরণ ঘটে আমাদের সন্তানদের উপর।
আনন্দদীপ্ত মন যদি শুভপরিচারী পারিপার্শ্বিক পায়, দুঃসহ বা অসুঃসহ হয় ক্বচিৎ। আনন্দিত অবস্থা হচ্ছে নিরুদ্বিগ্ন, নিরোগ নিঃশঙ্ক নিঃক্ষুৎ জীবন। যে শ্রেণি-পেশার মানুষ এমনি অবস্থানে ছিল, সভ্যতাণ্ডসংস্কৃতির বিকাশ তাদেরই দান। তাই আমাদের উচিত, অন্যের শুধু খারাপ দিকগুলো না খুঁজে ভালো দিকগুলোর প্রশংসাও জীবনে ইতিবাচক পদক্ষেপে সাহায্য করে। মনোবিদেরা বলেন, শিশুদের ভুল কাজের ক্রমাগত সমালোচনা না করে তারা যেগুলো পারে সেদিকে উৎসাহ দিতে। একই কথা বড়দের জন্যও প্রযোজ্য।
অন্যের ভালো দিকগুলো দেখতে শিখলে এবং প্রশংসা করতে পারলে মানসিকভাবে নিজে যেমন ভালো থাকা যায়, তেমনই অন্য মানুষটি ভালো থাকতে পারেন। সমস্যা নিয়ে ভাবার চেয়ে সমাধান নিয়ে ভাবলেও ভালো থাকার রসদ পাওয়া যায়। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’ নামে জার্নালে প্রকাশিত সমীক্ষা রিপোর্ট সেই কথাই বলছে। কোনো সমস্যায় পড়লে, কী হলে কী হত সেটা না ভেবে, বরং কী করা যায় সে দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। কারও সঙ্গে অশান্তি, তার সমাধান শান্তিপূর্ণ আলোচনায় হতে পারে।
‘ভালো আছি’, এই বিশ্বাসটা যদি মনে গেঁথে যায়, তা হলেও ভালো থাকা যায়। বিশ্বাসেও অনেক কিছু হয়। সবসময় হাসিমুখে থাকার চেষ্টা করলে, অন্যের মুখেও সেই হাসি কিন্তু ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধু, স্বজন, প্রতিবেশী যেই হউক না কেন সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সেবায় নিজেকে যদি যুক্ত করি তাহলে আমরা পরস্পর পরস্পরের পরমাত্মীয় হয়ে উঠব এবং স্রষ্টার অপূর্ব সৃষ্টির রূপ রস গন্ধ উপভোগে সমর্থ্য হবো।
সুন্দর আচরণ আমরা সবাই প্রত্যাশা করি। কিন্তু আমরা প্রায়ই অন্যের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করতে ভুলে যাই।
সামান্য একটু অসতর্কতার কারণে আমাদের আচরণে একজন মানুষ অনেক কষ্ট পেতে পারে। তাই আমাদের সবসময় সচেতন থাকা উচিত; যাতে আমাদের আচরণে কেউ বিন্দুমাত্র কষ্ট না পায়। যার আচরণ যত বেশি সুন্দর সবাই তাকে তত বেশি ভালোবাসে, সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। যার আচরণ ভালো নয়, সবাই তাকে ঘৃণা করে ও এড়িয়ে চলে। সুন্দর ব্যবহার সুন্দরভাবে কথা বলা সুন্দর মনের পরিচয় বহন করে। মানুষের একটি ভালো কথা যেমন একজনের মন জয় করে নিতে পারে, তেমনি একটু খারাপ বা অশোভন আচরণ মানুষের মনে কষ্ট আসে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিসেবে আমাদের উচিত সর্বদা মানুষের সঙ্গে ভালো ও সুন্দরভাবে কথা বলা। সবার সহযোগী হওয়া। যখনই আমাদের আচার আচরণ পরস্পরের প্রতি সত্য ও সুন্দরে উদ্ভাসিত হবে, তখনই সত্তা সমৃদ্ধি লাভ করবে, মানব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবো।
খেয়াল রাখতে হবে- সত্তা সচ্চিদানন্দময়। অসৎ নিরোধী স্বতঃই; সচ্চিদানন্দের পরিপোষক যা’ তা’ই ধর্ম। যথার্থ ধর্ম পালন আমাদের পরিশীলিত পরিশুদ্ধ করে তোলে। বুঝতে শিখি জীবনের আদল। উৎকর্ষতায় পর্যবসিত হই। গড়ে উঠে ত্যাগ, সেবার মন-মানসিকতা। মানবিক মাধুর্য্যে জন্ম নেয় সহানুভূতি। সহানুভূতি আনে সংহতি, সংহতি আনে শক্তি, শক্তি আনে সম্বর্ধনা। মানব জীবনের পরম লক্ষ্য জীবসেবা, পরোপকার। আর তাতেই আলিঙ্গন করে সংবর্ধনা। সহানুভূতি মানে প্রতিটি জীবের প্রতি আত্মিক ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আত্মার সৌন্দর্যের স্ফূরণ ঘটে সত্তাসংবর্দ্ধনী ও সত্তাসংরক্ষণী কাজে। প্রতিটি জীবের প্রতি যদি সহানুভূতিশীল না হই তাহলে মানবাত্মার অবমাননা ঘটে। আমরা যদি ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখি তাহলে দেখা যায়- এমন সময় ছিল, যখন প্রবল গ্রীকবাহিনীর বীরদর্পে বসুন্ধরা কম্পিত হইত। তাহারা এখন কোথায়?
তাহাদের চিহ্নমাত্র নাই। গ্রীসের গৌরব-রবি আজ অস্তমিত! এমন একদিন ছিল, যখন রোমের শ্যেনাঙ্কিত বিজয়পতাকা জগতের বাঞ্ছিত সমস্ত ভোগ্য পদার্থের উপরেই উড্ডীয়মান ছিল। রোম সর্বত্র যেত এবং মানবজাতির উপর প্রভুত্ব বিস্তার করত। রোমের নামে পৃথিবী কাঁপত। আজ ক্যাপিটোলাইন গিরি১ ভগ্নস্তূপমাত্রে পর্যবসিত! যেখানে সীজারগণ দোর্দণ্ডপ্রতাপে রাজত্ব করতেন, সেখানে আজ ঊর্ণনাভ তন্তু রচনা করছে। অন্যান্য অনেক জাতি এইরূপ উঠেছে, আবার পড়েছে, মদগর্বে স্ফীত হয়ে প্রভুত্ব বিস্তার করে স্বল্পকালমাত্র অত্যাচার-কলঙ্কিত জাতীয় জীবন যাপন করে তারা জলবুদ বুদের ন্যায় বিলীন হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে আপাতবিরোধী বহু সম্প্রদায় বর্তমান, অথচ সকলেই নির্বিরোধে বাস করিতেছে। এই অপূর্ব ব্যাপারের একমাত্র ব্যাখ্যা- পরধর্ম-সহিষ্ণুতা, পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা ও ভালোবাসা। প্রত্যেক মানুষে, প্রত্যেক প্রাণীতে- সে যতই দুর্বল বা মন্দ হউক, সে বড় বা ছোট হউক- সেই সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞ আত্মা রয়েছে। আত্মা হিসাবে কোনো প্রভেদ নেই- প্রভেদ শুধু প্রকাশের তারতম্যে। ঐ ক্ষুদ্রতম প্রাণী ও আমার মধ্যে প্রভেদ শুধু প্রকাশের তারতম্যে- স্বরূপতঃ তার সাথপ আমার কোন ভেদ নেই; সে আমার ভ্রাতা; তারও যে আত্মা, আমারও সেই আত্মা। অতি ক্ষুদ্রতম প্রাণী, এমন কি ক্ষুদ্র পিপীলিকা পর্যন্ত আমার ভাই—তারাও আমার দেহস্বরূপ।
এই চেতনার চৈতন্য ঘটলে প্রতি প্রত্যেক হয়ে উঠে একে অপরের পরিপূরক। তখন ধর্মে ধর্মে, জাত, সম্প্রদায়, গোত্র, বর্ণে আর বিভেদ থাকে না। প্রতিনিয়ত আমরা যে ছোট বড়, উঁচু নীচু নিয়ে ভেদ বিভেদের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছি তা মানবসভ্যতার অগ্রগতির জন্য বেদনাদায়ক। পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হই ভালোবাসায় একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসি তাহলে অদৃশ্য যে অতৃপ্তি তা আর থাকে না। কারণ ভালোবাসায় পৃথিবীর সবকিছু জয় করা যায়। ভালোবাসায় অযোগ্য যোগ্য হয়ে উঠে নিঃসন্দেহে। ভালোবাসার টান কর্মে আনে সফলতা জীবনে উত্থান। সমাজের সব ধর্ম বর্ণ শ্রেণির মানুষের মধ্যে সহানুভূতি সম্প্রীতি ভালোবাসা থাকে তাহলে সকল বিভেদ বৈষম্যের নিরাকরণ সম্ভব। আত্মার সৌন্দর্য উপলব্ধি হয় অনিন্দ্য সুন্দর আবেশে। কারো প্রতি ঘৃণা তুচ্ছতাচ্ছিল্য জন্ম দেয় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার, বাড়িয়ে দেয় মানসিক অস্থিরতা।
কোথাও কোথাও তা ধাবিত হয় আত্ম হননে।
আমাদের সমাজে তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া হিসেবে যাদের আমরা জানি এবং চিনি, দেখা যায় তাদের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত অবহেলা। কোথাও কোথাও মনে হয় তারা অস্পৃশ্য। খেয়ে পড়ে মানমর্যাদা নিয়ে তাদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই এমনতরো মনোভাব আমাদের মাথায় গেঁথে আছে। আমাদের যেমন সবকিছু পাবার, ভোগ করার অধিকার রয়েছে ঠিক তাদেরও। আমাদের একটু সহানুভূতি একমুঠো ভালোবাসা অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। আমরা মানুষ মানুষের হয়ে উঠি মানহুঁশে। প্রত্যেকেই আত্মস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে পরের কল্যাণে নিযুক্ত থাকা মানবোচিত কর্তব্য। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ এককভাবে জীবনযাপন করতে পারে না। পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমে সমাজে মানুষ সুখী নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে। আত্মস্বার্থকে উপেক্ষা করে সমষ্টিগত স্বার্থের জন্য আত্মনিবেদন করলে সমাজের প্রতিটি মানুষের সুখ-সুবিধা ও মঙ্গল নিশ্চিত হয়। কবির সেই বাণী- সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। আমাদের শিক্ষা যেন হয় সত্য সুন্দরে উদ্ভাসিত হওয়ার। আচার-আচরণ হোক পরিশীলিত পরিশুদ্ধ। প্রত্যেকে প্রত্যেকের সহযোগী হয়ে উঠি, সহভাগী হয়ে উঠি।
বাবুল কান্তি দাশ