ঢাকা শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

উন্নত নাগরিক গঠনের শর্তই হলো বইপাঠের অনিবার্যতা

এম মহাসিন মিয়া
উন্নত নাগরিক গঠনের শর্তই হলো বইপাঠের অনিবার্যতা

একটি উন্নত রাষ্ট্রের ভিত্তি শুধু ইট-কাঠ-লোহায় নির্মিত অবকাঠামো নয়, এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে উন্নত চিন্তাধারাসম্পন্ন নাগরিকের উপর। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে সমাজের সামগ্রিক আচরণ- সবকিছুর কেন্দ্রে আছে নাগরিক। নাগরিক যদি সচেতন, জ্ঞানী ও মানবিক হয়, তবে সমাজ এগোয়। আর যদি তারা অজ্ঞ, অসচেতন বা সংকীর্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন হয়, তবে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। সুতরাং উন্নত সমাজ গড়তে হলে প্রথম কাজ- উন্নত নাগরিক গড়ে তোলা। আর উন্নত নাগরিক তৈরি হয় উন্নত চিন্তাধারা থেকে।

কিন্তু উন্নত চিন্তা কীভাবে গড়ে ওঠে? এটি কোনো অলৌকিক প্রক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞানচর্চা, আত্মোন্নয়ন ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। পৃথিবীর যে কোনো মহান ব্যক্তির জীবনে তাকালেই দেখা যায়- তারা জ্ঞানকে আপন করে নিয়েছেন। কারণ জ্ঞান ছাড়া উন্নত চিন্তা সম্ভব নয়। আর এই জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে পরীক্ষিত ও কার্যকর পদ্ধতি হলো বইপাঠ।

মানুষের জীবনে অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হয়। প্রজ্ঞাবান মানুষের সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, নৈতিকতা ও জীবনদর্শন পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তাই উন্নত মানুষ হতে চাইলে উন্নত মানুষের জীবনী পড়া জরুরি। একজন মহৎ মানুষের পুরো জীবন- একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের জীবনী পাঠে আমরা বুঝতে পারি সৎ থাকা কতো কঠিন, সংগ্রাম কতো প্রয়োজনীয়, আর লক্ষ্য অর্জনে ধৈর্য কতো অপরিহার্য। উন্নত মানুষের শরণাপন্ন হওয়া মানে তাদের চিন্তাজগতে প্রবেশ করা, আর সেই প্রবেশের দরজা বই।

আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করি যখন তথ্যের স্রোত আমাদের চারদিকে ছড়িয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন-সংবাদ, ভিডিও- সবমিলিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত বিপুল তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছি। কিন্তু এর বেশির ভাগই দ্রুতগতির, পৃষ্ঠস্থ এবং ক্ষণস্থায়ী। তথ্যের এই ভিড়ে আমরা চিন্তার গভীরতা হারাতে বসেছি।

অন্যদিকে বই আমাদের ধীর শেখায়। বইয়ে ডুব দিলে মন শান্ত হয়, মনোযোগ বাড়ে, চিন্তা গভীর হয়। পাঠক নিজের মানসিক জগতে নতুন আলোর দিগন্ত খুঁজে পায়। বই পড়ার অভ্যাস চরিত্রকে দৃঢ় করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মবিশ্বাস দেয় এবং যুক্তিবোধকে শাণিত করে। একটি সমাজ তখনই স্থিতিশীল থাকে যখন তার মানুষ যুক্তিনিষ্ঠ হয়। আর যুক্তিনিষ্ঠ হওয়ার চর্চা বই ছাড়া আর কিছুই এত কার্যকরভাবে শেখায় না।

বইপাঠের সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। বই শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে বদলে দেয়। একজন পাঠক যেমন নিজের মানসিক পরিসরকে প্রসারিত করেন, তেমনই তিনি তার পরিবার, বন্ধুমহল এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেন। বই মানুষকে- দায়িত্ববোধী, মানবিক, সহনশীল, নৈতিক, যুক্তিসম্মত এবং উদার দৃষ্টিভঙ্গির হতে সহায়তা করে। আজকের সমাজে যখন অসহিষ্ণুতা, ভুল তথ্য, বিভ্রান্তি ও সাংঘর্ষিক অবস্থান ক্রমেই বাড়ছে, তখন বইপাঠের সংস্কৃতি একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করতে পারে। বই মানুষকে ভেতর থেকে প্রস্তুত করে- মানুষ হিসেবে, নাগরিক হিসেবে এবং সমাজের অংশ হিসেবে।

এছাড়াও উন্নত চিন্তা ও নাগরিক হওয়ার উৎসও বই। উন্নত নাগরিক হওয়া মানে শুধু নিয়ম মানা নয়, বরং দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, সহনশীলতা ও আত্মউন্নয়নের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। এসব গুণাবলি অর্জনের জন্য মানুষকে নিজের ভেতর কাজ করতে হয়, নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়, ভুলকে স্বীকার করতে হয়- যা বইপাঠই শেখায়। এ কারণেই বলা হয়- উন্নত চিন্তার ভিত্তি বই, আর উন্নত সমাজের ভিত্তি উন্নত চিন্তা। অতএব, উন্নত নাগরিক গড়ার প্রথম শর্ত- বইপাঠ। বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই- আজ নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না।

এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক ও লেখক, পার্বত্য চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত