ঢাকা শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

অনিরাপদ সড়ক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিল

অনিরাপদ সড়ক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিল

প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ খুললেই আমাদের চোখে পড়ে কোনো না কোনো মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার খবর। কোথাও স্কুলগামী শিশু, কোথাও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, আবার কোথাও পুরো একটি পরিবার পিষ্ট হচ্ছে বেপরোয়া গতির চাকায়। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর কেবল ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ভয়াবহ জাতীয় দুর্যোগ ও নিয়মিত ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’র প্রধান কারণ। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে থাকে এক একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং কান্নার দীর্ঘশ্বাস। প্রশ্ন হলো, সভ্যতার এই যুগে আমরা কি নিরাপদ সড়কের অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলেছি?

সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে বা সাধারণ ছুটির দিনে যখন মানুষের চলাচল বাড়ে, তখন সড়কের রক্তক্ষরণও বেড়ে যায়। এই মৃত্যুগুলোকে ‘অস্বাভাবিক’ বলা হচ্ছে কারণ এর বেশিরভাগই প্রতিরোধযোগ্য। যদি চালক দক্ষ হতেন, গাড়িটি ত্রুটিমুক্ত থাকত কিংবা সড়কটি ত্রুটিহীন হতো, তবে হয়তো এই প্রাণগুলো ঝরে যেত না। সড়কে যখন একজন মানুষের জীবন যায়, তখন শুধু একটি প্রাণ হারায় না, বরং একটি পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ প্রতিনিয়ত এই সড়কের শিকার হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতি।

সড়ক অনিরাপদ হওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু কারণ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। প্রথমত, বেপরোয়া গতি ও আইন অমান্য করার প্রবণতা। অনেক চালক ট্রাফিক আইনকে তোয়াক্কা করেন না। মহাসড়কগুলোতে উল্টো পথে গাড়ি চালানো বা অতিরিক্ত ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা নিত্যদিনের চিত্র। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই ভুয়া লাইসেন্স নিয়ে অনেক অদক্ষ চালক ভারী যানবাহন চালাচ্ছেন। তৃতীয়ত, ফিটনেসবিহীন যানবাহন। লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িগুলো মাঝরাস্তায় বিকল হয়ে বা ব্রেকফেল করে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। এছাড়া সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা, অবৈধ ফুটপাত দখল এবং পথচারীদের অসচেতনতাও এই সংকটের অন্যতম অনুষঙ্গ।

২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহন আইন কঠোর করা হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব বা পরিবহন সিন্ডিকেটের চাপের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হবে না। সড়ক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও এই সমস্যার অন্যতম কারণ। সড়কের মোড়ে মোড়ে চাঁদাবাজি এবং অব্যবস্থাপনা চালকদের অস্থির করে তোলে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের ড্রাইভিংয়ের ওপর। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা কোনো একক কর্তৃপক্ষের কাজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। চালকদের পেশাদার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে।

ত্রুটিপূর্ণ বাক সংশোধন এবং মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিযুক্ত কোনো গাড়ি যাতে সড়কে নামতে না পারে, সে ব্যাপারে আপসহীন হতে হবে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এখানে দলমত নির্বিশেষে বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যত্রতত্র রাস্তা পারাপার বন্ধ করে জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

সড়কে এই অস্বাভাবিক মৃত্যু আর মেনে নেওয়া যায় না। আমরা উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি, কিন্তু যদি আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা আদিম ও অনিরাপদ থেকে যায়, তবে সেই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রতিটি চালককে মনে রাখতে হবে, আপনার হাতে থাকা স্টিয়ারিংটি যেমন গতির চাবিকাঠি, তেমনি এটি অন্যের জীবনের দায়ভারও বহন করে। সরকার, পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণ- সবাই মিলে যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হই, তবেই সড়কের এই রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব। আমরা চাই না আর কোনো মা তার সন্তানকে হারাক, আর কোনো শিশু এতিম হোক। নিরাপদ সড়ক হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত