প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ জানুয়ারি, ২০২৬
এক সময় আমাদের অবসর মানে ছিল বই পড়া, গল্প শোনা, ক্রিকেট খেলা বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। এখন সেই অবসর কাটছে হাতের মুঠোয় বন্দি এক ছোট্ট স্ক্রিনে মোবাইলে। বিশেষ করে, গত কয়েক বছরে শর্ট ভিডিও কনটেন্টের জোয়ার তরুণ প্রজন্মের বিনোদনের ধরনই পাল্টে দিয়েছে। ১৫ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের ভিডিও যেখানে নাচ, গান, কমেডি, তথ্য, রিঅ্যাকশন, ট্রেন্ড সবকিছু মিলেমিশে আছে। প্রথমে মজার লাগলেও এই অভ্যাস এখন অনেকের জন্য আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলস, ইউটিউব শর্টস, ফেসবুক রিলস এই প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে একজন একবার স্ক্রল করা শুরু করলে থামা কঠিন হয়ে যায়। প্রতিটা ভিডিও শেষ হলেই সঙ্গে সঙ্গে নতুন একটা ভিডিও চলে আসে, আর মাথায় হয়তো আমরা ভাবি আচ্ছা, আরেকটা দেখি কিন্তু সেই ‘আরেকটা’ কখন ৫০-৬০ টায় গড়ায়, তা বোঝা যায় না। এর পেছনে কাজ করে ডোপামিন ইফেক্ট। ছোট ছোট ভিডিও দ্রুত বিনোদন দেয়, মস্তিষ্কে সুখের রাসায়নিক ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যা আমাদের আবারও সেই অভিজ্ঞতা নিতে প্রলুব্ধ করে।
সহজে পাওয়া বিনোদন- এক ক্লিকেই মজার কনটেন্ট, কোনো পরিশ্রম নেই। ট্রেন্ড ফলো করার চাপ- বন্ধুরা সবাই যদি নতুন কোনো ট্রেন্ড ফলো করে, নিজেকেও যুক্ত করতে ইচ্ছা হয়। দ্রুত মনোযোগ দখল- বড় ভিডিও বা লেখা পড়তে সময় লাগে, কিন্তু শর্ট ভিডিও কয়েক সেকেন্ডেই বিনোদন দেয়। ব্যক্তিগত প্রকাশের সুযোগ- অনেকে নিজেই ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল হওয়ার স্বপ্ন দেখে। বাস্তবতা থেকে পালানোর উপায়- একঘেয়ে পড়াশোনা বা চাকরির চাপ থেকে মুক্তি পেতে অনেকে এই ভিডিওতে ডুবে যায়। এখন দেখা যাচ্ছে, অনেক ছাত্রছাত্রী রাতে বই পড়ার বদলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস বা টিকটক দেখে। পরীক্ষার আগের রাতেও কেউ কেউ ভিডিও স্ক্রল করে সময় নষ্ট করছে। এর ফলে মনোযোগ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে লম্বা লেখা পড়তে বা ক্লাসে মনোযোগ দিতে সমস্যা হচ্ছে। সময়ের অপচয় দিনে ২-৩ ঘণ্টা এই ভিডিওতে কাটালে পড়াশোনা, ব্যায়াম বা অন্য শখের জন্য সময় থাকে না। ঘুমের ব্যাঘাত রাতে ভিডিও দেখার কারণে দেরিতে ঘুমানো, সকালে দেরি করে ওঠা। বাস্তব সম্পর্ক কমে যাওয়া সামনাসামনি কথা বলার বদলে স্ক্রিনে সময় বেশি কাটানো। শর্ট ভিডিও কনটেন্ট আসক্তি শুধু সময় নষ্ট করছে না, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলছে। তুলনার ফাঁদ অন্যদের সাজানো জীবন দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে হওয়া। দ্রুত সন্তুষ্টির অভ্যাস সহজেই মজা পাওয়া অভ্যাসে পরিণত হলে বাস্তব জীবনের ধৈর্যশীল কাজগুলো বিরক্তিকর লাগে। উদ্বেগ ও হতাশা ভিউ বা লাইক না পেলে মন খারাপ, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া।
অবিরাম স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘাড় ও পিঠে ব্যথা, ওজন বেড়ে যাওয়া এসবও বেড়ে যাচ্ছে।
ডঐঙ-এর তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক সক্রিয়তা কমিয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
মোবাইল আসক্তির কারণে অনেক তরুণ এখন পরিবারের সাথে খাওয়ার সময়ও ফোন নামাতে চায় না। বন্ধুদের সাথে দেখা হলেও একসাথে বসে রিলস দেখা বা নতুন ট্রেন্ডের ভিডিও বানানোই মূল আড্ডা হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগের গভীরতা কমে গিয়ে উপরে-উপরে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। এখন মোবাইল ও শর্ট ভিডিওর প্রভাব শুধু তরুণ প্রজন্মে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক মধ্যবয়সী মানুষও ফেসবুক রিলসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন। তবে তরুণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারণ তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় পড়াশোনা, ক্যারিয়ার গঠনের সময় এভাবেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সময় সীমা ঠিক করা দিনে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি শর্ট ভিডিও না দেখা। বিনোদনের বিকল্প খোঁজা বই পড়া, খেলাধুলা, নতুন কিছু শেখা। নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা বারবার ভিডিও দেখার প্রলোভন কমাতে। পড়াশোনা ও কাজকে প্রাধান্য দেওয়া সময় ব্যবস্থাপনা শেখা। পিতামাতা ও শিক্ষকের ভূমিকা সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ ও বিনোদনপূর্ণ করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যখন সেই প্রযুক্তি আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, তখনই সমস্যা শুরু হয়।
আরশী আক্তার সানী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়