প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছে আজ আমরা দাবি করি যে আমরা এক গণতান্ত্রিক ও মানবিক বিশ্বে বাস করছি। কিন্তু পর্দার আড়ালে বিশ্বরাজনীতির নিষ্ঠুর খেলা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আজ শুধু অভিধানের পাতায় বন্দি এক প্রহসন মাত্র। যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার পেশিশক্তির জোরে অন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাকে তুলে নিয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিশ্বব্যযস্থাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। একজন সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে অন্য একটি দেশ নিজ দেশের আইনে বিচার করার জন্য ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সভ্য পৃথিবীর ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত। এটি শুধু একজন ব্যক্তির অপহরণ নয়, বরং একটি জাতির মানচিত্রকে লাঞ্ছিত করা। আজ পৃথিবীর আকাশে বারুদ আর আধিপত্যবাদের কালো ধোঁয়া; যেখানে দুর্বলের আর্তনাদ সবলের অট্টহাসিতে ঢাকা পড়ে যায়।
একুশ শতকের সভ্য পৃথিবীতে আমরা যখন মানবাধিকার আর গণতন্ত্রের জয়গান গাইছি, তখন পর্দার আড়ালে চলছে এক পৈশাচিক ক্ষমতার খেলা। স্বাধীনতার সংজ্ঞা আজ অভিধানে সীমাবদ্ধ, আর সার্বভৌমত্ব যেন শুধু পরাশক্তিদের খেলনা। যখন একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে অন্য একটি দেশ প্রকাশ্য দিবালোকে বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তুলে নিয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে পৃথিবীতে কোনো আইনের শাসনে নেই, বরং এটি একটি আধুনিক ‘জঙ্গলরাজ’। এই অবিচার শুধু একটি দেশের নেতার ওপর নয়, বরং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত। মা যেমন তার সন্তানকে আগলে রাখেন, রাষ্ট্রও তেমনি তার নাগরিকের শেষ আশ্রয়। কিন্তু আজ যখন পরাশক্তিরা সেই আশ্রয়ের মূলে কুঠারাঘাত করে, তখন মানবতার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়াই স্বাভাবিক।
পরাশক্তি কর্তৃক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বে সর্বশেষ আঘাত হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বছরের ৩ জানুয়ারি মধ্যরাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, বিশেষ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করা হয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর সন্ত্রাস দমন ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’ এই অভিযানে সরাসরি অংশ নেয়। নিস্তব্ধ রাতে আকাশচুম্বী প্রাসাদের ওপর অতর্কিতে নেমে আসে বিদেশি হেলিকপ্টারের গর্জন।
যুক্তরাষ্ট্রের কাপুরুষোচিত এই অপহরণ অভিযানে প্রেসিডেন্টের কয়েকজন দেহরক্ষীকে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মার্কিন অভিযানে কিউবার নাগরিকসহ মোট ৫৭ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এই নেক্কারজনক অভিযান সম্পন্ন করে ৫ জানুয়ারি সকালে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে হাজির করে। সেখানে মাদুরো নিজেকে ‘অপহৃত প্রেসিডেন্ট’ এবং ‘যুদ্ধের বন্দী’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
এই ঘটনার চার যুগ পূর্বে অতন্দ্র প্রহরীদের স্তব্ধ করে দিয়ে একদল বিশেষ বাহিনী প্রাসাদে প্রবেশ করে ল্যাটিন আমেরিকার আরেকটি দেশে। ইতিহাসের পাতায় এ নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক ঘটনাটি হলো ১৯৮৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে অপহরণ। যুক্তরাষ্ট্র পানামা আক্রমণ করে এবং নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করে ফ্লোরিডায় নিয়ে আসে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন সময় পরাশক্তিগুলো তাদের স্বার্থের পথে বাধা হওয়া নেতাদের সরিয়ে দিয়েছে বা অপহরণ করেছে। নিবন্ধের এ পর্যায়ে আমি যুক্ত করছি পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে সরকার প্রধানকে অপহরণের ঐতিহাসিক আরো কয়েকটি ঘটনাপ্রবাহ : মোহাম্মদ মোসাদ্দেক (ইরান, ১৯৫৩): সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্সের ষড়যন্ত্রে তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও গৃহবন্দী করা হয়।
প্যাট্রিস লুমুম্বা (কঙ্গো, ১৯৬১) : বেলজিয়াম ও যুক্তরাষ্ট্রের মদদে তাকে অপহরণ ও পরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
সালভাদর আলেন্দে (চিলি, ১৯৭৩) : ক্যু-এর মাধ্যমে তাকে আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হয়, যার নেপথ্যে ছিল পরাশক্তির মদদ।
জঁ-বার্ট্রান্ড অ্যারিস্টিড (হাইতি, ২০০৪) : অভিযোগ রয়েছে যে, মার্কিন সেনারা তাকে জোরপূর্বক বিমানে তুলে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যবস্থা আসলে গায়ের জোরের ওপর টিকে আছে, আইনের ওপর নয়। এবার না হয় আলোকপাত করা যাক এসব জঘন্য কর্মকান্ড বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ?
আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী কোনো দেশই অন্য কোনো দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত করতে পারে না। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানরা দায়মুক্তি ভোগ করেন। কোনো দেশ আইনগতভাবে অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করতে পারে না। এটি পরিষ্কারভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। নিবন্ধে এ ধাপে আমরা দেখব বর্তমান পৃথিবীর পরাশক্তিদের ‘সভ্যতা’ ও সার্বভৌমত্বের সংকটের বিষয়টি: বিশ্বের পাঁচটি পরাশক্তি (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও ব্রিটেন) আজ নিজেদের ‘সভ্যতার শিক্ষক’ দাবি করে। কিন্তু তাদের ইতিহাস যুদ্ধ, আগ্রাসন আর শোষণের। তারা অন্য দেশকে সভ্যতা শেখানোর অজুহাতে গণতন্ত্র রপ্তানি করতে চায়, কিন্তু বিনিময়ে নিয়ে যায় সেই দেশের সম্পদ। আজ বিশ্বের ছোট দেশগুলোকে সার্বভৌম মনে হয় না, কারণ তাদের সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই পরাশক্তিদের রাজধানী থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। পাঁচটি পরাশক্তি তাদের প্রতিবেশীদের জন্য সবসময়ই এক ভয়ের নাম। নিবন্ধে এ ধাপে আমরা আসছি পরাশক্তি দেশ প্রতিবেশী ও বিশ্ব সার্বভৌমত্বের জন্য কি ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে
যুক্তরাষ্ট্র : ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে নিজের ‘পেছনের উঠান’ মনে করে যখন তখন হস্তক্ষেপ করে।
রাশিয়া : ইউক্রেন ও জর্জিয়ার সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীন : দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান ইস্যুতে প্রতিবেশীদের চাপে রাখছে। এই দেশগুলো অর্থনৈতিক অবরোধ, সাইবার যুদ্ধ এবং সামরিক হুমকির মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করছে।
এই স্তরে আমি যুক্ত করছি পরাশক্তিগুলো তুলনামূলক দুর্বল দেশগুলোর তৈলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করার জন্য যেভাবে বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করিয়ে আগ্রাসন পরিচালনা করে- এটির সুদূরপ্রসারী প্রভাব, যেমনটি সর্বশেষ ভেনেজুয়েলায় হচ্ছে : ভেনেজুয়েলার সংকট মূলত দেশটির বিশাল তেলের মজুদকে কেন্দ্র করে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বৈধ সরকারকে উৎখাত করতে বিভিন্ন সময় চাপ সৃষ্টি করেছে এবং বিকল্প নেতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদি কোনো প্রেসিডেন্টকে সম্পদ দখলের জন্য তুলে নেওয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষের ভাষায়-“মা মারা গেছে বড় কথা নয়, আজরাইল যে বাড়ি চিনেছে এটাই বড় ভয়।’ এর অর্থ হলো, আজ ভেনেজুয়েলার সাথে যা হয়েছে, কাল তা অন্য যেকোনো ছোট দেশের সাথে হতে পারে। পরাশক্তিরা একবার কোনো দেশে হস্তক্ষেপের পথ চিনে গেলে সেই দেশের নিরাপত্তা চিরতরে বিলীন হয়ে যায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভেনেজুয়েলার আয়তন প্রায় ৯১৬,৪৪৫ বর্গ কিমি, যা বাংলাদেশের (প্রায় ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিমি) প্রায় ৬ গুণ বড়। এটি আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর ৯৩তম অতি ক্ষুদ্র দেশ বাংলাদেশের জন্য ও অশনি সংকেত।
পরাশক্তিগুলোর গত ১০০ বছরের বিভিন্ন আগ্রাসন ও তার প্রভাব নিম্নে আলোকপাত করা হলো : গত ১০০ বছরে আমরা দেখেছি ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক আক্রমণ, আফগানিস্তানে বিশ বছরব্যাপী যুদ্ধ এবং লিবিয়ার ধ্বংসযজ্ঞ। এই আগ্রাসনগুলো বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করেছে, শরণার্থী সংকট সৃষ্টি করেছে এবং চরমপন্থার জন্ম দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরাশক্তিদের প্রতি ঘৃণা ও অনাস্থা বেড়েছে।
পরাশক্তির এই ধরনের অপকর্ম বিশ্বের অধিকাংশ নাগরিকের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যখন একজন নেতার ওপর অবিচার হয়, তখন রাজনৈতিক আদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার জয়গান গাওয়া উচিত। ভেনেজুয়েলা বা পানামার মতো ঘটনার সময় বিশ্বের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের উচিত- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। পরাশক্তিদের পণ্য বর্জন এবং কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ব মানবতাকে প্রাধান্য দেওয়া।
একই ধরনের ঘটনা যাতে পরবর্তী সময়ে আর সংগঠিত না হয়, এই লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও ছোট দেশগুলো নিম্নলিখিত করণীয় নির্ধারণ করতে পারে। যদিও, জাতিসংঘ বর্তমানে পরাশক্তিদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে- নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা বাতিল বা সংস্কার করতে হবে। পাঁচ পরাশক্তি ব্যতীত অন্য দেশগুলোকে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করতে হবে (যেমন: জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যামণ্ডএর পুনরুজ্জীবন)। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে আরও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করতে হবে।
পরাশক্তিদের বুঝতে হবে যে, ঘৃণা দিয়ে কখনো স্থায়ী সাম্রাজ্য গড়া যায় না। তাদের উচিত-অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। অর্থনৈতিক শোষণের পরিবর্তে ন্যায্য বাণিজ্যে মনোযোগী হওয়া। সামরিক বাজেটের একটি বড় অংশ বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করা।
বিশ্ব আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা যদি এখনই পরাশক্তিদের এই উদ্ধত আচরণের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। স্বাধীনতা শুধু পতাকায় নয়, স্বাধীনতা থাকতে হবে সিদ্ধান্তে। কোনো রাষ্ট্রপ্রধান যেন কোনো পরাশক্তির দাবার ঘুঁটি না হন, সেটি নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। পৃথিবীটা সবার- এখানে গায়ের জোর নয়, বরং ভ্রাতৃত্ব আর ন্যায়বিচারই হোক শেষ কথা।
পরাশক্তি দেশগুলো যদি নিজেদের শুধরে নিতে চায়, তবে তাদের অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ‘সভ্য’ হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হলো অন্যের সীমানাকে সম্মান করা। বিশ্বের ছোট-বড় সকল দেশের উচিত একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গঠন করা, যা শুধু পরাশক্তির তল্পিবাহক হবে না। সার্বভৌমত্ব কোনো দয়া নয়, এটি প্রতিটি জাতির জন্মগত অধিকার। পৃথিবীটা সবার; এখানে গায়ের জোরে নয়, বরং ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক-এটাই হোক আজকের প্রার্থনা।
পরিশেষে বিশ্ববাসীর নিকট বলতে চাই- এ কোন বর্বরতা, স্বাধীন দেশের বুকে এ কেমন আঘাত? সার্বভৌমত্বের রক্তে রাঙানো এ কেমন বিচার? প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে আজ গভীর অপমান, এ কী নীতি? এই অন্যায়, এই বর্বরতার প্রতিবাদ হোক বিশ্বের প্রতিটি কোণায়, জেগে ওঠো, হে ন্যায়পরায়ণ জাতি, রুখে দাঁড়াও এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জয় হোক, হোক সম্মান পুনরুদ্ধার!
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
লেখক ও প্রাবন্ধিক