প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ মার্চ, ২০২৬
মার্চের মাঝামাঝি, ক্যালেন্ডারের পাতায় এখনী বসন্তের রেশ থাকার কথা, অথচ আকাশ থেকে ঝরছে যেন গলিত সিসা। ভোরের স্নিগ্ধতা ফিকে হতে না হতেই তপ্ত পিচঢালা পথ থেকে উঠে আসছে আগুনের হলকা। যে শহরে বাতাসের গান শোনার কথা ছিল, সেখানে আজ বইছে মরুভূমির তপ্ত ‘লু-হাওয়া’। পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০ বছরে ঢাকার তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কোনো কোনো এলাকায় এই দহন গ্রামের চেয়ে ৭ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি। কিন্তু এই অস্বাভাবিক অগ্নিদাহ শুধু ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ নামক কোনো বিমূর্ত বৈশ্বিক সমস্যার ফল নয়; বরং এটি আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ন ও আত্মঘাতী উন্নয়ন দর্শনের এক চরম মূল্য। আমরা গড়ে তুলেছি কংক্রিটের জঙ্গল, আর তার চড়া মাশুল দিচ্ছি শরীর পোড়ানো এই ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা ‘নগর তাপীয় দ্বীপ’ প্রভাবে। আমাদের প্রিয় শহরগুলো আজ একেকটি উত্তপ্ত কড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন আজ ওষ্ঠাগত।
একটি শহর কেন তার আশপাশের অঞ্চলের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তার কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কঙ্কাল বেরিয়ে আসে। প্রথমত, শহরের গঠনশৈলী। আধুনিক শহর মানেই পিচঢালা কালো রাস্তা, কংক্রিটের বিশাল অট্টালিকা এবং কাঁচের দেয়ালঘেরা ভবন। এই উপকরণগুলো দিনের বেলা সূর্যের তাপ প্রচণ্ডভাবে শোষণ করে ধরে রাখে। গ্রামাঞ্চলে মাটি বা গাছপালা সেই তাপ বাষ্পীভবনের মাধ্যমে প্রস্বেদন ঘটিয়ে প্রকৃতিকে শীতল করে; কিন্তু শহরে সেই সুযোগ নেই। রাতে যখন প্রকৃতি ঠান্ডা হওয়ার কথা, তখন এই কংক্রিট ও পিচ তাদের ধরে রাখা তাপ বিকিরণ করতে শুরু করে।
ফলে রাতভর শহর আর ঠান্ডা হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের ভবনগুলোর স্থাপত্যশৈলী। বর্তমানে গ্লাস টাওয়ার বা কাঁচের দেওয়াল দেওয়া ভবনের সংস্কৃতি বাড়ছে। এই কাঁচগুলো সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে পাশের রাস্তা বা ভবনকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির অবাধ ব্যবহার। আমরা নিজেদের ঘর ঠান্ডা রাখতে গিয়ে এসির বাইরের ইউনিট দিয়ে যে পরিমাণ গরম বাতাস রাস্তায় ছাড়ছি, তা বাইরের পথচারী বা সাধারণ মানুষের জন্য নরকযন্ত্রণা তৈরি করছে। এটি একটি দুষ্টচক্র, গরম বাড়ে বলে আমরা এসি চালাই, আর এসির কারণে বাইরের পরিবেশ আরও গরম হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, সবুজায়ন ও জলাশয় অর্থাৎ ফুসফুস যখন অকেজো শহরের। একটি আদর্শ শহরের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি বা সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের নগর পরিকল্পনায় সবুজের স্থান হয়েছে শুধু কাগজে-কলমে। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে আমরা শতবর্ষী গাছ কেটে ফ্লাইওভার বানাচ্ছি, পার্কগুলোকে কংক্রিটের পার্কে রূপান্তর করছি। গাছ শুধু ছায়া দেয় না, এটি বায়ুমণ্ডলের কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে অক্সিজেন দেয় এবং পানি বাষ্পীভূত করে বাতাসকে প্রাকৃতিক উপায়ে ঠান্ডা রাখে। একই চিত্র আমাদের জলাশয়গুলোর ক্ষেত্রেও। নদী, খাল, পুকুর ও ঝিলগুলো ছিল শহরের ‘পকেট এসি’। জলাশয় থেকে পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আশপাশের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে রাখত। কিন্তু গত তিন দশকে আমরা শুধু ঢাকাতেই অর্ধেকের বেশি জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছি। ফলে বৃষ্টির পানি যেমন নামতে পারছে না, তেমনি শহরের তাপমাত্রা কমার প্রাকৃতিক পথটিও রুদ্ধ হয়ে গেছে। আজ আমরা যে তীব্র দাবদাহে পুড়ছি, তা মূলত আমাদের প্রকৃতিবিরোধী আচরণেরই প্রতিফলন। চর্তুথত, আইনি কাঠামো ও নীতিমালার ব্যর্থতা। একজন আইনের ছাত্র হিসেবে যখন দেখি আমাদের দেশে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য চমৎকার সব আইন থাকা সত্ত্বেও তার প্রয়োগ নেই, তখন হতাশ হতে হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এ স্পষ্ট বলা আছে যে, প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান জলাশয় ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এমনকি ড্যাপ (DAP) বা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানেও সবুজের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি রাজউকের নকশা অমান্য করে ভবনের চারপাশের ফাঁকা জায়গা ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। আমাদের দেশে ‘বনায়ন’ বলতে অনেক সময় শুধু শোভাবর্ধক ছোট চারা লাগানোকে বোঝানো হয়; কিন্তু বড় ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষরোপণের বা সংরক্ষণের কোনো দীর্ঘমেয়াদি আইনি বাধ্যবাধকতা বা তদারকি নেই। ভবনের ছাদে বাগান করা উৎসাহিত করার জন্য সিটি কর্পোরেশন ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স ছাড়ের ঘোষণা দিলেও তার সঠিক প্রচার ও বাস্তবায়ন আজও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বন্দি।
তাহলে এবার আসি সমাধানের পথ : সবুজ ও নীলের মেলবন্ধন: এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুব একটা সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। আমাদের এখন ‘গ্রে টু গ্রিন’ বা কংক্রিট থেকে সবুজের দিকে ফেরার সময় এসেছে। প্রথমত. ছাদ বাগান ও ভার্টিকাল ফরেস্ট্রিতে জোর দিতে হবে। আমাদের ভবনের ছাদগুলো যদি পরিকল্পিতভাবে সবুজায়ন করা যায়, তবে ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা অন্তত ৩-৫ ডিগ্রি কমানো সম্ভব। যেসব ভবনের ছাদে জায়গা নেই, তারা ভবনের দেওয়ালে লতানো গাছ বা বিশেষ পদ্ধতিতে ‘ভার্টিকাল ফরেস্ট্রি’ করতে পারেন। এটি ভবনকে সূর্যের সরাসরি তাপ থেকে রক্ষা করবে এবং শহরের বায়ুর মান উন্নত করবে।
দ্বিতীয়ত, নগর বনায়ন ও পকেট পার্ক তৈরি করতে হবে। রাস্তার ধারে শোভাবর্ধক গাছের বদলে স্থানীয় বড় ছায়াদানকারী গাছ (যেমন- বকুল, ছাতিম, জারুল) রোপণ করতে হবে। শহরের ছোট ছোট খালি জায়গায় ‘পকেট পার্ক’ তৈরি করতে হবে যেখানে শুধু ঘাস আর গাছ থাকবে, কোনো কংক্রিটের বেঞ্চ বা ওয়াকওয়ে নয়। তৃতীয়ত, স্পঞ্জ সিটি ও জলাধার পুনরুদ্ধারে আইন ও সচেতনতা তৈরি করগে হবে। আমাদের শহরগুলোকে ‘স্পঞ্জ সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যা বৃষ্টির পানি শোষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখবে এবং উপরিভাগের তাপ কমাবে। ভরাট হওয়া খাল ও পুকুরগুলো দখলমুক্ত করে সেগুলোকে পুনরায় কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। চতুর্থত, স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনায় পরিবর্তন করতে হবে। রাস্তা ও ফুটপাতে পিচের বদলে তাপ-সহনশীল টাইলস বা ‘কুল পেভমেন্ট’ ব্যবহার করা যেতে পারে। ভবনের নকশায় এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে, ফলে এসির ওপর নির্ভরতা কমে।
প্রকৃতির ওপর আমাদের এই অত্যাচার যদি বন্ধ না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের শহরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু মানুষের শারীরিক কষ্টের কারণ নয়, এটি শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় ইমারত বা মসৃণ রাস্তা নয়; উন্নয়ন মানে একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য পরিবেশ।
নগর পরিকল্পনাবিদ, সরকার এবং সাধারণ নাগরিক, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের এই উত্তপ্ত শহরগুলোকে আবার শীতল করতে। আসুন, আমরা ঘর থেকে শুরু করি। অন্তত নিজের ছাদে বা বারান্দায় একটি গাছ লাগাই, দখল হওয়া জলাশয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। আমরা যদি আজ প্রকৃতির যত্ন না নেই, তবে প্রকৃতি আমাদের ক্ষমা করবে না। আগামী প্রজন্মের কাছে একটি মরুভূমি নয়, বরং একটি সুজলা-সুফলা ও শীতল শহর রেখে যাওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
মো. ইমন হোসেন
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়