প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ মার্চ, ২০২৬
মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে যে গুণটি সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দেয়, তা হলো মানবতা। মানবতা কেবল দয়া বা সহানুভূতি নয়; বরং এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার সমন্বয়। এই মানবিক মূল্যবোধই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—বর্তমান সময়ে সেই মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোর উন্নয়নের দৌড়ে এগিয়ে গেলেও মানবতার জায়গাটি অনেক ক্ষেত্রে শূন্য হয়ে যাচ্ছে। ফলে মানবতার সংকট আজ সভ্যতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার বদলে অনেকেই দাঁড়িয়ে শুধু ভিডিও ধারণ করে। বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। শুধু তাই নয়, বড় শহরগুলোতে অভাবী মানুষের প্রতি উদাসীনতা, বৃদ্ধ বা অসহায়দের অবহেলা- এসব ঘটনা মানবতার অবক্ষয়কে প্রকাশ করছে। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত উদাসীনতার পরিচয় দেয় না, বরং আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংকটও প্রমাণ করে।
মানবতার সংকটের আরেকটি কারণ হলো- সামাজিক বৈষম্য, প্রতিযোগিতা ও স্বার্থপর জীবনযাত্রা। মানুষ এখন নিজের স্বার্থ রক্ষায় এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে অন্যের কষ্ট বা দুর্দশার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে। বড় শহরের চাকরি প্রতিযোগিতা, ধনী-গরিবের পার্থক্য, ক্ষমতার লোভ- এসব সামাজিক বাস্তবতা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা এবং নৈতিক বোধকে ক্রমেই ক্ষুণ্ণ করছে। অর্থ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকেই মানবিক মূল্যবোধকে তুচ্ছ মনে করছে। ফলে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠার জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ- এই তিনটি স্তরে শিক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ভালো ফলাফল বা চাকরি নিশ্চিত করাকেই লক্ষ্যবস্তু করে ফেলেছে। ফলে শিক্ষিত হওয়া মানেই মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হওয়া নয়। পরিবারেও শিশুদের নৈতিক শিক্ষা কম, আবেগ ও সহমর্মিতা গড়ে তোলার পরিবেশ সীমিত। এই শিক্ষা ও পরিবেশের ঘাটতি সমাজে মানবতার সংকটকে আরও তীব্র করছে।
মানবিক অবক্ষয় শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আচরণে নয়; এটি গুরুতর সামাজিক অপরাধের কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ধর্ষণ, মাদকাসক্তি, যৌন নিপীড়ন, শিশু শ্রম- এসব কেলেঙ্কারি এবং সামাজিক অনৈতিকতার মূল কারণের মধ্যে অন্যতম হলো মানবিকতার অভাব। ধর্ষণ কখনোই একটি মানবিক মানুষ করতে পারে না; এটি মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রমাণ। এছাড়া মাদকাসক্ত যুবকের সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অশান্তির পেছনেও মানবিক সংবেদনশীলতার অভাব দায়ী।
মানবতার সংকট মোকাবিলায় সমাজের প্রতিটি স্তরের দায়িত্ব অপরিহার্য। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান- সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশুকাল থেকেই শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা জরুরি। সমাজে সচেতন উদাহরণ ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে, যাতে মানুষ মানবিক আচরণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে।
একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজের জন্য মানবতার বিকল্প নেই। মানবতা থাকলে সমাজে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি পায়, সহযোগিতা শক্তিশালী হয়, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়; বরং মানুষের হৃদয়ে মানবতার বিকাশে নিহিত। তাই মানবতার আলোকে জাগ্রত রাখা আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। মানবতা বেঁচে থাকলে তবেই সভ্যতা সত্যিকার অর্থে টিকে থাকবে।
মো. আমিনুর রহমান
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়