ঢাকা বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

নির্বাচন আসে নির্বাচন যায় কৃষকের ভাগ্য কতটুকু বদলায়

ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয়
নির্বাচন আসে নির্বাচন যায় কৃষকের ভাগ্য কতটুকু বদলায়

কৃষক আমাদের দেশের প্রাণশক্তি, এই মর্মবাণী আমরা ভুলে যাই। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন আমাদের সামনে নতুন আশার দরজা খুলে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেয়, কৃষি হবে আধুনিক, কৃষক পাবে ন্যায্যমূল্য, ভর্তুকি বাড়বে, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আরও মজবুত হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- নির্বাচন ঘুরে ফিরে এলেও কৃষকের জীবনে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটে? বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। গ্রাম, মাটি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। অথচ কৃষক আজও সবচেয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাসকারী শ্রেণিগুলোর একটি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে দামের অস্থিরতা, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং ঋণের চক্র। এসব মিলিয়ে কৃষকের জীবন যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। নির্বাচনের আগে কৃষকের কথা রাজনৈতিক ভাষণে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। তখন বলা হয়- কৃষিপণ্য সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা হবে, সার-বীজ সহজলভ্য হবে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে, কৃষিঋণ হবে সহজ ও সুদমুক্ত, কৃষিকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হবে। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই সেই প্রতিশ্রুতিগুলো অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। মাঠের বাস্তবতা বদলায় ধীরে, কখনও বদলায়ই না। কৃষকের সবচেয়ে বড় সমস্যা উৎপাদন নয়, বিপণন। কৃষক ফসল ফলায়, কিন্তু তার দাম নির্ধারণ করে অন্যরা। ধান কাটার মৌসুমে দাম পড়ে যায়, আর যখন বাজারে সংকট তৈরি হয় তখন লাভবান হয় ব্যবসায়ী ও মজুতদাররা। কৃষক তখন দর্শক মাত্র। নির্বাচন বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু বাজারব্যবস্থার এই কাঠামোগত বৈষম্য বদলায় না। আরেকটি বড় প্রশ্ন, কৃষি কি সত্যিই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে? বাজেট বক্তৃতায় কৃষির গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা খুব কমই বাস্তবায়িত হয়। কৃষি গবেষণা, সংরক্ষণ অবকাঠামো, কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাত শিল্প, গ্রামীণ সরবরাহব্যবস্থা। এসব খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ ছাড়া কৃষকের ভাগ্য বদলানো সম্ভব নয়। কৃষকের সন্তান আজ আর কৃষিতে থাকতে চায় না। কারণ সে দেখে, তার বাবার সারাজীবনের পরিশ্রমের বিনিময়ে নিরাপত্তা নেই, সম্মান নেই, স্থিতিশীল আয় নেই। কৃষি যদি টেকসই জীবিকার পথ না হয়, তবে ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।

নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব- এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কৃষকের জীবনে পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, নীতির স্থায়িত্ব, এবং কৃষিকে অর্থনীতির প্রান্তিক নয়, কেন্দ্রীয় খাত হিসেবে বিবেচনা করা। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সরাসরি বাজারসংযোগ তৈরি করা, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণ, ফসল বীমা চালু করা এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন। এসব পদক্ষেপই পারে নির্বাচনের ভাষণকে বাস্তব উন্নয়নে রূপ দিতে। পরিশেষে বলতে হয়, নির্বাচন কি শুধু ক্ষমতার পালাবদল ঘটায়, নাকি মানুষের জীবন বদলায়? যেদিন কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য দাম পাবে, ঋণের বোঝা নয় বরং নিরাপত্তা পাবে, কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া হবে সম্মানের সঙ্গে- সেদিনই বলা যাবে, নির্বাচন শুধু এসেছে- যায়নি, পরিবর্তনও এনেছে।

ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয়

কবি ও প্রাবন্ধিক, সম্পাদক-অভিসার (ছোটকাগজ)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত