প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নগরজীবন ও মহাসড়কগুলোতে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি একটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রথম দেখায় এটি একটি সাধারণ ছিঁচকে চুরি মনে হলেও, এর ভয়াবহতা আসলে অবর্ণনীয়। একটি ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হওয়া মানেই রাস্তার মাঝখানে একটি সুগভীর মৃত্যুফাঁদ তৈরি হওয়া। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন রাস্তা জলমগ্ন থাকে অথবা রাতে যখন পর্যাপ্ত আলোর অভাব থাকে, তখন এই খোলা ম্যানহোলগুলো পথচারী, রিকশা এবং মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে দাঁড়ায়। এই সস্তা ধাতুর লোভে কিছু মানুষ যেভাবে অন্যের জীবনকে বিপন্ন করছে, তা শুধু অপরাধ নয়, বরং চরম অমানবিকতা।
ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির ফলাফল শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব বহুমুখী এবং প্রায়শই অপূরণীয়। গত কয়েক বছরে ঢাকনা খোলা ম্যানহোলে পড়ে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত অনেকের প্রাণহানি ঘটেছে। যারা বেঁচে ফেরেন, তাদের অনেককেই বরণ করতে হয় স্থায়ী পঙ্গুত্ব। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বা একটি সম্ভাবনাময় শিশুর জীবন এভাবে অকালে ঝরে পড়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দ্রুতগতির যানবাহন যখন হঠাৎ? খোলা ম্যানহোলের ওপর দিয়ে যায়, তখন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য এটি চরম বিপজ্জনক। এছাড়া চাকা দেবে গিয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যা নগরের সচলতাকে ব্যাহত করে। ঢাকনা না থাকলে ম্যানহোলের ভেতরে ইট, পাথর, পলিথিন ও অন্যান্য আবর্জনা পড়ে নালা জট পাকিয়ে ফেলে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। প্রতি বছর হাজার হাজার ঢাকনা চুরি হওয়ার ফলে সরকারকে বিশাল অংকের টাকা পুনরায় ব্যয় করতে হয়। জনসেবার টাকা এভাবে অপচয় হওয়া উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায়।
মূলত লোহার ঢাকনার উচ্চ বাজারমূল্য এবং চোরাই মাল কেনার শক্তিশালী সিন্ডিকেটই এই চুরির প্রধান কারণ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি বা অতি দরিদ্র কিছু মানুষ খুব অল্প টাকার জন্য এই কাজ করে থাকে। তবে মূল অপরাধী তারা, যারা এই ঢাকনাগুলো কিনে গলিয়ে ফেলে বা অন্য কাজে ব্যবহার করে। আইনের শিথিলতা এবং যথাযথ তদারকির অভাবে এই চক্র দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ এবং কাঠামোগত পরিবর্তন।
লোহা বা কাস্ট আয়রনের ঢাকনাগুলো চোরদের মূল লক্ষ্য। এর পরিবর্তে যদি উন্নত প্রযুক্তির রিইনফোর্সড সিমেন্ট কনক্রিট (RCC) বা ফাইবার রিইনফোর্সড পলিমার (FRP) এর ঢাকনা ব্যবহার করা হয়, যার কোনো পুনঃবিক্রয় মূল্য নেই, তবে চুরির প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। উন্নত বিশ্বের মতো ম্যানহোলের ঢাকনায় আধুনিক লকিং সিস্টেম বা চেইন ব্যবহার করা যেতে পারে, যা বিশেষ সরঞ্জাম ছাড়া খোলা অসম্ভব। জনবহুল এলাকাগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা বাড়ানো এবং রাতে পুলিশের টহল জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ভাঙারি দোকান বেশি, সেখানে কড়া নজরদারি প্রয়োজন।
ম্যানহোলের ঢাকনা চুরিকে শুধু সাধারণ চুরি হিসেবে না দেখে ‘জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করতে হবে। চোর এবং ক্রেতা উভয়ের জন্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রাখতে হবে। আপনার এলাকার ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। এছাড়া স্থানীয় পর্যায় থেকে যদি মহল্লাভিত্তিক পাহারার ব্যবস্থা করা যায় বা চোরাই মাল বিক্রেতাদের বয়কট করা হয়, তবে এই সংকট দ্রুত সমাধান হবে।
ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি কোনো তুচ্ছ ঘটনা নয়, এটি একটি নীরব ঘাতক। একটি আধুনিক শহরে নাগরিকরা নিরাপদে পথ চলবে- এটি তাদের মৌলিক অধিকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আর কালক্ষেপণ না করে লোহার ঢাকনা অপসারণ করে বিকল্পসামগ্রী ব্যবহারের দিকে দ্রুত নজর দিতে হবে। আমরা আর কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া বা কোনো মানুষের অকাল মৃত্যু দেখতে চাই না। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা এবং জনগণের সচেতনতাই পারে আমাদের শহরকে নিরাপদ করে তুলতে।