ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

দেশের নিরাপত্তা সংকট : উদ্বেগ, বাস্তবতা ও রাষ্ট্রের করণীয়

এম মহাসিন মিয়া
দেশের নিরাপত্তা সংকট : উদ্বেগ, বাস্তবতা ও রাষ্ট্রের করণীয়

দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্যদিয়ে অতিক্রম করছে। জনমনে ক্রমাগত উদ্বেগ বাড়ছে, যা শুধু সামাজিক অস্থিরতাই সৃষ্টি করছে না, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটেছে যে, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কাঠামোগত দুর্বলতা, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কার্যকর সিদ্ধান্তের অভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে র‌্যাবের সঙ্গে দুর্বৃত্তদের সংঘটিত ভয়াবহ ঘটনাটি এই সংকটের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। দায়িত্ব পালনকালে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর সশস্ত্র ও সংঘবদ্ধ হামলা শুধু রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়নি, বরং জনগণের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা আরও গভীর করেছে। একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বিপজ্জনক বার্তা-যেখানে সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর প্রকাশ্যে আক্রমণ চালানোর সাহস পায়।

এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল গোয়েন্দা তৎপরতা, অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং অপরাধ দমনে কার্যকর কৌশলের অভাবের বহিঃপ্রকাশ। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা, শিল্পাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চল-সব জায়গাতেই সংগঠিত অপরাধ ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর ফলে অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং রাষ্ট্রীয় আইনকে তোয়াক্কা না করেই নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছে।

বিশেষ করে জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সন্নিকটে রেখে এ ধরনের ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এই সময়ে যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি দুর্বল থাকে, তবে ভোটারদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়, নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং সহিংসতার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অথচ বাস্তবতা হলো, বর্তমান পরিস্থিতি সেই আস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

একটি স্বাধীন দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা এভাবে চলতে পারে না। রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করা। যখন সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার চিত্র বারবার সামনে আসে, তখন জনগণের আস্থা রাষ্ট্রের ওপর থেকে সরে যেতে শুরু করে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যদি নিজেরাই অনিরাপদ বোধ করেন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কতটা কঠিন হয়ে পড়ে, তা সহজেই অনুমেয়।

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের ভূমিকা শুধু প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া উচিত নয়। ঘটনার পর অভিযান, গ্রেপ্তার বা বিবৃতি দিয়ে দায় শেষ করা যাবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত নিরাপত্তা নীতি। প্রথমত, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। অপরাধ সংঘটনের আগেই ঝুঁকি নিরূপণ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও সুরক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে তারা আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

তৃতীয়ত, সন্ত্রাস ও সংগঠিত অপরাধের পেছনের মূল উৎস-অবৈধ অস্ত্র, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ছত্রচ্ছায়াকে চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে শাস্তির ভয় কার্যকর হবে না। দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বল বিচারিক প্রক্রিয়া অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। চতুর্থত, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি ভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। কারণ জনগণের সহযোগিতা ছাড়া কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাই টেকসই হতে পারে না।

এছাড়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলোও উপেক্ষা করা যাবে না। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, শিক্ষা ও নৈতিকতার অবক্ষয় অনেক সময় অপরাধপ্রবণতাকে উসকে দেয়। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু শক্তি প্রয়োগ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ।

সবমিলিয়ে বলা যায়, দেশের নিরাপত্তা সংকট এখন আর উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন-সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সময় এসেছে পরিস্থিতির গভীরতা উপলব্ধি করে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত, সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অন্যথায়, এই নিরাপত্তাহীনতা দেশের অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিশ্চিত বাস্তবতা রেখে যাবে।

এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত