প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬
আইনের শাসন বাক্যটা আমাদের কাছে পরিচিত একটি শব্দ। আইনের শাসন বলতে আইনের চোখে সবাই সমান, সব নাগরিকের জন্য আইন সমান। জনগণ ও সরকার সবাই আইনের অধীন।
রাষ্ট্র ও ব্যক্তি- উভয়ের সব কার্যক্রম আইন দ্বারা পরিচালিত হয় এবং তা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। আইনের শাসন নিশ্চিত করে দেশ পরিচালিত হবে ‘আইন দ্বারা’, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ‘ইচ্ছা দ্বারা নয়। আইনের শাসনের মাধ্যমে সবার জন্য সমান আইনের প্রয়োগ, সমান ন্যায়বিচার প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে। আইনের শাসন শুধু আইন থাকার উপর নির্ভর করে না বরং সেই আইনগুলোর মান এবং সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগের উপর নির্ভর করে।
আমরা সংবিধানে আইনের শাসনের ব্যাখ্যায় দেখতে পায় সবার জন্য আইন সমান। কিন্তু বাস্তবে আইন সবার জন্য সমানের কথা বলা হলেও কার্যত বর্তমান আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আইন সবার জন্য সমান নয়। আমাদের দেশের সাধারণ গরিব জনগণ টাকার অভাবে থানা-আদালতে ন্যায়বিচার পায় না। আবার যার কাছে টাকা আছে সে টাকা দিয়ে আইনকে নিজের পক্ষে কিনে নেয়। টাকার জোরে আইনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে। সাধারণ গরিব জনগণ টাকার অভাবে ন্যায় বিচার পায়না। যার ফলে দুর্বল প্রভাবহীন ব্যক্তি কখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। আমাদের দেশের আইনের শাসনের প্রধান সমস্যা হচ্ছে যথাযত ও উপযুক্ত আইন না থাকা এবং যে আইন রয়েছে তা প্রয়োগে শৈতিল্যতা ও বাধা। এক কথায়, আমাদের দেশের বিচার ও শাসন কার্যপরিচালনায় যে আইন রয়েছে তার মান ভালো নয়।
এ দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থা অপরাধীকে আরও বেশি অপরাধ করতে উৎসাহিত করেছে। এর মাধ্যমে আইনের শাসন বলতে বুঝায় চোরকে চুরি করতে উৎসাহিত করা। বর্তমানে আমাদের দেশে যে আইন কাঠামো রয়েছে সেই আইনি কাঠামো অনুযায়ী অপরাধিকে শাস্তি না দিয়ে আইনের ফাঁকফোকরের মাধ্যমে সাহায্য করা হয়। কয়েক মাস আগের ঘটনা, আমাদের এলাকার দুইজন পাতি ছিনতাইকারি ছিনতাই করতে গিয়ে একজন ড্রাইভার কে চুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। এলাকার লোকজন ছিনতাইকারিদের ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছে। ২ মাস যেতে না যেতে ঐ ছিনতাইকারিকে বিচারক যেকোনো কিছুর বিনিময়ে জামিন দিয়ে দিল। জামিন লাভ করার পর ঐ ছিনতাইকারি পুনরায় তার পুরোনো পেশা ছিনতাই করতে আরম্ভ করল। উচিত ছিল সেই অপরাধীকে উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সহসাত ফাঁসি কিংবা যাবত জীবনদ-ে দণ্ডিত করার ব্যবস্থা করা। কিন্তু তা না করে আইন প্রয়োগকারীরা অপরাধীকে সহসাত জামিন পাইয়ে দেওয়া কোনো ন্যায়বিচারের উদাহারণ নয়। বরং এটি বাদীপক্ষের উপর মারাত্মক জুলুম। এর মাধ্যমে অপরাধীকে অপরাধ করতে আরও বেশি উৎসাহিত করা হয়েছে। এখানে আইনের শাসন ও ন্যায্যবিচার না থাকার কারণে অপরাধী বার বার অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়েছে। এভাবে অনেক খুনের মামলার আসামি আমাদের চোখের সামনে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুলিশ দেখেও না দেখার ভান করছে।
বাংলাদেশে মামলা পরিচালনায় আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে মামলার দীর্ঘসূত্রতা। সব কিছুর একটা শেষ আছে কিন্তু বাংলাদেশের মামলার শেষ নেই। যুগের পর যুগ ধরে মামলা চলতে থাকে, খালাস হয় না। লাখ লাখ মামলা বিচারাধীন অবস্থায় কোর্টে জুলে আছে, কোনো সুরাহা নেই। মামলার দীর্ঘ সূত্রতার কারণে ও সাধারণ গরিব জনগণ ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আদালত মানবিক বিবেচনার অযুহাত দেখিয়ে আসামিকে সহসাত জামিনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। অন্যদিকে বাদীপক্ষের লোকজনের মধ্য দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ততদিনে বাদী- সাক্ষীর কেউ একজন দুনিয়া ছেড়ে পরকালে চলে যায়। এভাবে পড়ে থাকে হাজার হাজার মামলার নথিপত্র। যদি মামলার রায় ১ বছরের কম সময়ের মধ্য সম্পন্ন করা হত তাহলে মামলার জট সমস্যার সৃষ্টি হত না। মানুষ হয়রানির স্বীকার হত না এবং সহসাত ন্যায় বিচার পেত। অপরাধীরা অপরাধ করতে সংকোচ করত এবং মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে ভয় পেত।
আমরা সিনেমা ও পাঠ্যপুস্তকে বার বার দেখেছি পড়েছি, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। এই দেশে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে না, টাকা ও ক্ষমতার গতিতে চলে। যার কাছে টাকা ও ক্ষমতার জোর বেশি আইন ও তার পক্ষে কাজ করে। থানা- আদালতে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। লোকমুখে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, কোর্টের দেয়াল ও নাকি ঘুষ খায়। বাংলাদেশে আইন আছে বিচার নাই কথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশে যে আইন আছে তা যথার্থ নয় এবং আইনের প্রয়োগও একদম সীমিত। শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে এক মাস হল। একটি মানুষকে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন নিরব, নেই কোনো দায়বদ্ধতা প্রকাশ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এরকম বিচারহীনতার সংস্কৃতি পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। সরকারের এই নীরবতা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বিচার ব্যবস্থা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত আপনি আমি কেউ নিরাপদ নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীন নিরপেক্ষভাবে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার বন্দোবস্ত করে তাহলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। সেজন্য সরকারকে নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করতে হবে। যে কোনো অপরাধের বিচার নির্ভর করে অপরাধের ভয়াবহতার উপর নয়, বরং কে অপরাধ করেছে এবং কে ভুক্তভোগী তার উপর। দিনের পর দিন এভাবে যদি বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠে, তাহলে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়। যখন কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে একটি ক্ষুদ্র এলিট শ্রেণির দখলে চলে যায় তখন আইন সাধারণ মানুষের জন্য অকার্যকর হয়ে উঠে।
বিচারহীনতার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রুপটি আমরা দেখতে পায় ধর্ষণের ঘটনাগুলোতে। প্রায় প্রতিদিনই কাথাও না কোথাও নারী বা শিশু ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছে। কিছুদিন পত্র পত্রিকায় আলোচনা- সমালোচনার ঝড় বয়য়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে সব হারিয়ে যায়। ভিকটিম সঠিক ন্যায় বিচার পায় না, বছরের পর বছর ঝুলে থাকে মামলার রায়। ধর্ষণ শুধুমাত্র একটি অপরাধ নয়, এটি হয়ে উঠেছে বিচারহীনতার সবছেয়ে নগ্ন প্রদর্শনী। ধর্ষণ এদেশে এখন বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম কোনো ঘটনা নয়, এটি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। আমরা ধরে নিই, ধর্ষণের সঠিক বিচার না হওয়ার পেছনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিচ্ছা ও দুর্নীতিই দায়ী। কিন্তু বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। এখানে সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম কাজ করে পুলিশ, মেডিকেল রিপোর্ট, ফরেনসিক, প্রসিকিউশন, আইনজীবী, প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাব। প্রত্যেক স্তরে এমন মানুষ বসে আছেন, যাদের কাছে ন্যায় বিচারের চেয়ে নিজের সুবিধা ও ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ধর্ষণের মতো জগন্যতম অপরাধ ও দরকষাকষির বিষয়ে পরিণত হয়।
আমাদের দেশে খুন ও ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনায় মানুষ কেনো ন্যায্য বিচার পায় না। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে ন্যায় বিচার কার্যকরে প্রভাব বিস্তার করা। এদেশে আইনের চেয়ে পরিচয় ও ক্ষমতা বেশি কার্যকর। অভিযুক্ত যদি প্রভাবশালী হয়, তাহলে মামলার গতি থেমে যায়। ভুক্তভোগী যদি দরিদ্র হয় তাহলে মামলাও দুর্বল হয়। ফলে প্রভাবশালীদের সন্তানেরা পার পেয়ে যায়, আর সাধারণ ভুক্তভোগী পরিবারের সন্তানরা ন্যায় বিচারের আশায় থানা-আদালতে বারান্দায় ঘুরে বেড়ায়। বাংলাদেশের থানা আদালতে যদি ন্যায়বিচারকে প্রবাহিত করা না হত এবং আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হত তাহলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পেত। ন্যায়বিচার পেতে হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হত না।
যখন জবাবদিহিতা এবং আইনের কাঠামো ভেঙে পড়ে তখন খুন, ধর্ষণ ও সহিংসতা মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পায়। এই বিচারহীনতার সামাজিক প্রভাব গভীর। বিচারহীনতার কারণে মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারায়। খুন-ধর্ষিতার পরিবার মানুসিকভাবে ভেঙে পড়ে। অপরাধীরা সাহস পায়, কারণ তারা জানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিছু হবে না। এই ভাবেই অপরাধ একটি সামাজিক মহামারিতে রূপ নেয়।
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট