প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলার নদীনির্ভর সভ্যতার পতনের ইঙ্গিত বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, এই ভূখণ্ডের মানুষ নদীর কাছে যতটা ঋণী, সম্ভবত পৃথিবীর খুব কম জাতি ততটা। নদীর স্রোত, খালের গভীরতা, পুকুরের স্থির জল সবই একসময় মানুষকে দিয়েছে খাদ্য, পুষ্টি ও জীবিকা। সেই জীবনধারার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশি মাছ। কিন্তু আজ দেশের নদী যখন সংকুচিত, খাল মৃতপ্রায়, পুকুর দূষিত তখন দেশি মাছের হারিয়ে যাওয়া যেন বাংলার জলজ সভ্যতার পতনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলাভূমির অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মাছের প্রাকৃতিক ঘরের ধ্বংস বাংলাদেশে গত ৩০-৪০ বছরে প্রায় ৫০ শতাংশ স্বাভাবিক জলাভূমি হারিয়ে গেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। একসময় যেসব বিল ও হাওরে বর্ষায় মাছের প্রজনন হতো, শুষ্ক মৌসুমে যেগুলো আশ্রয়স্থল ছিল, সেগুলো এখন কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়, এককালে যেখানে নৌকা চলত, এখন সেখানে মোটরবাইক চলে। জলাভূমি হারানো মানে মাছের ঘর হারানো এটি সরাসরি সংখ্যার পতনে প্রভাব ফেলছে। নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ার বহুমাত্রিক প্রভাব নদীর প্রবাহ কমে গেলে প্রথম আঘাত আসে ডিম পাড়ার চক্রে। মাছ সাধারণত অগভীর, শান্ত, ঝোপযুক্ত পানিতে ডিম পাড়ে। কিন্তু অতিরিক্ত নাব্যতা, পলি জমে নদীর পেট ভরাট হয়ে যাওয়া এবং শুকনো মৌসুমে পানির গভীরতা কয়েক ফুটের নিচে নেমে যাওয়া এ প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। ফলে অনেক প্রজাতির মাছ প্রজননের উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পায় না। মৌসুমি নদীর মৃত্যু দেশি মাছের জন্য বড় বিপর্যয় বাংলাদেশে প্রচুর মৌসুমি নদী ছিল, যেগুলো বর্ষায় ফুলে উঠত এবং মাছের চলাচলের প্রধান পথ তৈরি করত। কিন্তু এখন অনেক মৌসুমি নদী ভরাট, দখল বা বালুমহলের কারণে অচল হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষার পানি এলেও মাছ পূর্বের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নতুন বাসস্থানে যেতে পারে না। এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া মাছের প্রজননকে অর্ধেকেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মিঠাপানির গুণগত মান কমে যাওয়া মাছের বেঁচে থাকার জন্য অযোগ্য পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো জলাশয়ে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে মাছ বাঁচতে পারে না। দূষণের কারণে এখন অনেক খাল ও নদীতে অক্সিজেনের পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। মাছের উপরিভাগে উঠে বাতাস নেওয়ার দৃশ্য এখন অনেক জায়গায় দেখা যায়, যা প্রকৃতির জন্য বিপজ্জনক সংকেত।
কৃষির অতিরিক্ত রাসায়নিকের ক্ষতি অদৃশ্য বিষে মাছের মৃত্যু গ্রামে গেলে দেখা যায় ধানক্ষেতে পানি রেখে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, যা পরে খাল-বিলে মিশে যায়। এই রাসায়নিকগুলো মাছের সংবেদনশীল শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে ক্ষুদ্র প্রজাতি যেমন পুঁটি, মলা, চেলা এদের দেহ ছোট হওয়ায় রাসায়নিক সহজেই জমা হয় এবং দ্রুত মৃত্যু ঘটে। অবৈধ জাল মাছের শত্রুতে পরিণত হওয়া মানুষের লোভ কারেন্ট জাল একসময় মাছ ধরার দ্রুত উপায় মনে হলেও এখন এটি দেশি মাছকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। এই জালে বড় মাছ তো ধরা পড়ে-ই, ছোট ডিম-ফোটা পোনাও রেহাই পায় না। ফলে একটি মাছের প্রজন্ম শেষ হয়ে যায়। একবার প্রজন্ম ধ্বংস হলে সেই প্রজাতির ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। অতি-শিকার বা Overfishing মাছের জীবনের সময় দেওয়া হচ্ছে না গ্রামের খাল-বিলে এখন সারা বছরই মাছ ধরা হয়। আগে শীত বা বর্ষার নির্দিষ্ট সময় ছাড়া মাছ ধরা কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হতো। কিন্তু এখন মাছের ডিম পাড়ার মৌসুমেও ধরা হয়। এতে মাছ বড় হওয়ার সময় পায় না। মাছের জীবনচক্র পূর্ণ না হলে প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়া সময়ের ব্যাপার। বিদেশি মাছ চাষের কারণে খাদ্য প্রতিযোগিতা টিলাপিয়া বা সিলভার কার্পের মতো মাছ স্বল্প সময়ে বড় হয়, ফলে চাষিরা এগুলো বেশি চাষ করে। কিন্তু এরা খাবারের জন্য দেশি মাছকে বঞ্চিত করে। কোনো বিল বা পুকুরে বিদেশি মাছ থাকলে দেশি মাছের খাবারের পরিমাণ কমে যায়, ফলে দেশি মাছ বড় হতে পারে না বা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে প্রকৃতির ছন্দের অমিল মাছের প্রজনন নির্ভর করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, বৃষ্টির পরিমাণ ও পানির উচ্চতার উপর। জলবায়ু পরিবর্তনে মৌসুমি বৃষ্টির ধরন বদলে গেছে। বর্ষা কম হলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়, আবার বেশি বর্ষা হলে ডিম ভেসে যায়। এই পরিবর্তন মাছের জীবনধারাকে অস্থিতিশীল করেছে। দেশি মাছের বিলুপ্তির দিকে অগ্রসর হওয়া প্রজাতির তালিকা পাবদা, গজার, শোল, বাইন, রানি, চিতল, মলা, ঢেলা, চেলা এসব মাছ এখন অনেক জেলায় বিরল। যেসব বাজারে আগে ঝুড়িভর্তি দেশি মাছ থাকত, এখন সেখানে বিদেশি মাছেই ভরপুর। আজকের শিশুরা অনেক নামই চিনতে পারে না। একসময় যে মাছ খাবারের স্বাভাবিক অংশ ছিল, সে আজ স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তন মাছ আর শৈশবের গল্প নেই গ্রামে শৈশবের অন্যতম আনন্দ ছিল পুকুরে গামছা পেতে পুঁটি বা চেলা ধরা, খালে ঝাঁপ দিয়ে মাছ দেখা, বর্ষায় বিলে নৌকা ভাসানো। এখন এসব ছবি আর দেখা যায় না। জলাশয়ের অভাবে মাছও নেই, মাছ ধরার খেলা নেই; ফলে গ্রামীণ শৈশবের স্বাভাবিক দৃশ্যও হারিয়ে যাচ্ছে। দেশি মাছের পুষ্টিগুণ হারানো স্বাস্থ্যগত ক্ষতি দেশি মাছ পুষ্টিগুণে ভরপুর ওমেগা ৩, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, প্রাকৃতিক প্রোটিন। এসব পুষ্টি এখন বিদেশি মাছের কারণে হারিয়ে গেছে। পুষ্টিবিদেরা মনে করেন, দেশি মাছের অভাব এখন মানুষের স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।অর্থনৈতিক ক্ষতি জেলে সম্প্রদায় বিপদের মুখে দেশের বহু মানুষের জীবিকা মাছ ধরা। নদী-খালে মাছ কমে যাওয়ায় জেলেদের আয় কমে গেছে। অনেক পরিবার পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছে। কিছু অঞ্চলে দেখা যায়, আগে যেসব গ্রামে মাছ ধরা ছিল প্রধান কাজ, এখন সেখানে মানুষ কৃষিকাজ বা দিনমজুরিতে চলে গেছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষয় খাদ্যসংস্কৃতির পরিবর্তন দেশি মাছের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিভিন্ন রেসিপি মলার টকঝাল, টেংরার ঝোল, শোল মাছের পাতলা ঝোল, কই মাছের দইঝোল, পাবদার দোপেয়াজা। এগুলো এখন বিরল। রান্নাঘরে নতুন প্রজন্ম দেশি মাছের স্বাদই জানে না। খাদ্যসংস্কৃতির এ ক্ষতি একটি জাতির পরিচয়কে দুর্বল করে। পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট জলজ বাস্তুতন্ত্র বিপর্যয়ের পথে মাছ শুধু খাদ্য নয় জলজ পরিবেশে শৃঙ্খলার অংশ। মাছ শৈবাল নিয়ন্ত্রণ করে, পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখে। মাছ কমে গেলে শৈবাল বাড়ে, পানিতে দুর্গন্ধ হয়, অক্সিজেন কমে যায়। ফলে পুরো জলজ পরিবেশ ভেঙে পড়ে। দেশি মাছের বিলুপ্তির সঙ্গে সেই পরিবেশের পতনও দ্রুততর হয়েছে।
আরশী আক্তার সানী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ