ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বিলুপ্তির পথে বাংলার বৈচিত্র্যময় দেশি বীজ

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
বিলুপ্তির পথে বাংলার বৈচিত্র্যময় দেশি বীজ

‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’- কবির এই বাণীতে যে উর্বরতার কথা বলা হয়েছে, তার প্রাণভোমরা হলো আমাদের দেশি বীজ। কিন্তু গত কয়েক দশকে সবুজ বিপ্লবের নামে উচ্চ ফলনশীল (HYV) এবং হাইব্রিড বীজের আগ্রাসনে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী দেশি বীজ আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। কৃষি ও কৃষকের এই নীরব হাহাকার নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন। এক সময় বাংলাদেশে প্রায় ১৫ হাজার জাতের ধানের বীজ ছিল। আউশ, আমন, বোরো, প্রতিটি মৌসুমের জন্য ছিল আলাদা আলাদা সুগন্ধী ও পুষ্টিকর ধান। শুধু ধান নয়, বেগুন, শিম, লাউ কিংবা পাটের বীজেও ছিল অসাধারণ বৈচিত্র্য। আমাদের কৃষকরা নিজেরাই ছিলেন বীজের সংরক্ষণাগার। তারা নিজের ক্ষেতের সেরা ফসল থেকে বীজ তুলে রাখতেন পরের বছরের জন্য। এই বীজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বাঙালির সংস্কৃতি, নবান্ন আর মাটির ঘ্রাণ।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অধিক ফলনের প্রলোভন দেখিয়ে কৃষকদের হাতে তুলে দিচ্ছে হাইব্রিড ও জিএমও (GMO) বীজ। এই বীজগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এগুলো থেকে একবার ফসল হওয়ার পর আর দ্বিতীয়বার বীজ সংরক্ষণ করা যায় না। অর্থাৎ, প্রতি বছর কৃষককে চড়া দামে কোম্পানি থেকে বীজ কিনতে হচ্ছে। এর ফলে কৃষক তার চিরকালীন স্বনির্ভরতা হারিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির দাসে পরিণত হচ্ছে। দেশি বীজ যেখানে রোগবালাই প্রতিরোধে সক্ষম ছিল, সেখানে হাইব্রিড বীজ চাষ করতে গিয়ে কৃষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশকের বোঝা।

দেশি বীজগুলো ছিল এদেশের প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। খরা, বন্যা কিংবা লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা ছিল আমাদের কাটারিভোগ, কালোজিরা বা বালাম ধানের। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে তৈরি হাইব্রিড বীজ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে অত্যন্ত দুর্বল। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে যখন লোনা পানি লোকালয়ে ঢুকছে, তখন বিদেশি বীজগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। অথচ আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক দেশি বীজ লোনা পানিতেও ফলন দিতে সক্ষম ছিল, যা আমরা অবহেলায় হারিয়ে ফেলেছি।

দেশি জাতের সবজি ও শস্যে যে পরিমাণ খনিজ ও পুষ্টি উপাদান থাকে, হাইব্রিড ফসলে তার ছিটেফোঁটাও নেই। সার ও কীটনাশক দিয়ে ফলানো এই চকচকে ফসলগুলো আসলে আমাদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগব্যাধি ছড়াচ্ছে। স্বাদ ও সুগন্ধে দেশি জাতের সঙ্গে হাইব্রিডের কোনো তুলনাই হয় না। পুরোনো প্রজন্মের মানুষরা আজও আক্ষেপ করেন সেই হারিয়ে যাওয়া স্বাদ আর গন্ধের জন্য।

বীজ হারানো মানে হলো খাদ্য নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হারানো। যদি বীজের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে বিদেশি কোম্পানির হাতে চলে যায়, তবে তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যেকোনো সময় দেশকে জিম্মি করতে পারে। বর্তমানে কিছু পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সচেতন কৃষক ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘বীজ ব্যাংক’ গড়ে তুলছেন। কিন্তু এটি রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে বড় ধরনের সহায়তা ছাড়া টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আমাদের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি প্রযুক্তি আমদানির চেয়ে দেশি বীজের মানোন্নয়নে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে দেশি বীজ সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।

উপরোক্ত দুটি প্রতিবেদনই আমাদের বর্তমান সময়ের দুটি জ্বলন্ত সমস্যাকে নির্দেশ করে। ডিজিটাল জুয়া যেমন আমাদের সামাজিক ও মানসিক কাঠামো ধ্বংস করছে, তেমনি দেশি বীজের বিলুপ্তি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই উভয় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কঠোর তদারকি এবং তৃণমূল পর্যায়ে গণসচেতনতা।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত