ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি

প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিপক্ষের মাছের পুকুরে বিষ প্রয়োগ, ফসলের খেত কেটে ফেলা কিংবা শখের কলার বাগান উপড়ে ফেলার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। মানুষের মধ্যকার বিরোধ যখন অবলা প্রাণী, বৃক্ষলতা কিংবা ঘাম ঝরানো শ্রমের ফসলের ওপর গিয়ে পড়ে, তখন তা শুধু অপরাধ নয়, বরং চরম বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়। এই আদিম ও বিধ্বংসী প্রতিহিংসা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর মূলে কুঠারাঘাত করছে।

একজন কৃষক বা উদ্যোক্তা যখন একটি মাছের খামার বা ফলের বাগান গড়ে তোলেন, তার পেছনে থাকে মাসের পর মাস হাড়ভাঙা খাটুনি, পুঁজি এবং একরাশ স্বপ্ন। পুকুরে বিষ ঢেলে কয়েক লাখ টাকার মাছ মেরে ফেলা কিংবা এক রাতেই শত শত কলাগাছ কেটে ফেলার অর্থ হলো- একটি পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। এই সম্পদগুলো কোনো নির্জীব বস্তু নয়, বরং এগুলো প্রাণ ও প্রকৃতির অংশ। নিজের ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে যখন কেউ গাছ কাটে বা মাছ মারে, তখন সে মূলত জীববৈচিত্র্য এবং সৃষ্টির শৃঙ্খলার ওপর আঘাত হানে। মানুষের ঝগড়ার বিচার আদালতে বা সামাজিকভাবে হতে পারে, কিন্তু সেই রোষের শিকার কেন হবে ফলন্ত গাছ বা নিরপরাধ মাছ?

ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে করা এই ধ্বংসযজ্ঞ আদতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি। বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ, যেখানে প্রতিটি মাছ এবং প্রতিটি শস্যদানা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার অংশ। বর্তমান বাজারে যখন নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, তখন এক বিঘার একটি সবজি খেত নষ্ট করা মানে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানো। অনেক সময় উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে এসব খামার গড়ে তোলেন। একটি প্রতিহিংসামূলক কাজ শুধু সেই উদ্যোক্তাকেই নিঃস্ব করে না, বরং পুরো ব্যাংকিং খাত এবং গ্রামীণ বিনিয়োগকেও নিরুৎসাহিত করে।

এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির প্রধান কারণ হলো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব। গ্রামীণ সালিশে সাধারণত এই অপরাধগুলোকে হালকাভাবে দেখা হয় অথবা অর্থের বিনিময়ে রফাদফা করার চেষ্টা চলে। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে আরও বড় ধ্বংসযজ্ঞে মেতে ওঠে। প্রচলিত আইনে অন্যের সম্পদ ধ্বংস করার কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য। এই বিচারহীনতাই দুর্বৃত্তদের সাহস জোগাচ্ছে যে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ফসলের ওপর আঘাত করাই সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী পথ।

মানুষ যখন যুক্তিতে হেরে যায় বা আইনি পথে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে ভয় পায়, তখনই সে চোরাগোপ্তা হামলার পথ বেছে নেয়। রাতের আঁধারে পুকুরে বিষ দেওয়া বা খেত উজাড় করা কাপুরুষতার চরম লক্ষণ। এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অন্যের কষ্টার্জিত ফসল দেখে হিংসা হয় এবং সেই হিংসা মেটাতে প্রকৃতিকে ধ্বংস করতেও আমরা দ্বিধাবোধ করি না। এই সংস্কৃতি যদি বন্ধ না হয়, তবে আগামী প্রজন্ম কৃষিকাজে উৎসাহ হারাবে এবং সমাজ আরও বেশি সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এই বিধ্বংসী ধারা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ফসলি জমি বা মাছের খামারে হামলার ঘটনাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার আইনের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে পুলিশকে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে হবে। এলাকাভিত্তিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। শুধু জেল-জরিমানা নয়, অপরাধীর কাছ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা আইনিভাবেই নিশ্চিত করতে হবে।

মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব চিরকালীন, কিন্তু সেই দ্বন্দ্বের জেরে প্রকৃতি ও শ্রমের ফসল ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মাছের পুকুর বা কলার বাগান কোনো পক্ষের শত্রু নয়। এগুলো দেশের সম্পদ। আমরা যদি আজ এই বর্বরতার বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে প্রতিহিংসার এই বিষ একদিন আমাদের গোটা সমাজকেই গ্রাস করে ফেলবে। মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক এবং শ্রমের প্রতিটি ফোঁটা ও প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণ সুরক্ষিত থাকুক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত