ঢাকা বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার যেন কৃষিবান্ধব হয়

মো. নাজমুল হাসান
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার যেন কৃষিবান্ধব হয়

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন এখন জাতির দোরগড়ায়। জনগণের ভোট পাওয়ার জন্য বা তাদের কাছে আনার জন্য প্রতিটি দল ভোটের আগে কিছু অঙ্গীকার করে থাকে জাতির কাছে। তাকে এক কথায় আমরা নির্বাচনি ইশতেহার বলি। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি কাজ শুরু করার আগে সব রাজনৈতিক দল জাতির সামনে তাদের রাজনৈতিক ইশতেহার ঘোষণা করে। নির্বাচিত হলে তারা জনগণ ও দেশের জন্য কী কী কাজ করবে, কী কী পদক্ষেপ নেবে তা খুব জমকালো আয়োজনের মধ্যে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া সবার উপস্থিতিতে তা পেশ করে থাকে।

কিন্তু এবারের নির্বাচন টা একটু ব্যতিক্রম। গতানুগতিক নির্বাচনের মতো এবারের নির্বাচন হবে না এটাই বাস্তবতা। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর জনগণ ফিরে পেয়েছে তাদের বাক স্বাধীনতা ও ফিরে পেয়েছে তাদের ভোটের অধিকার। প্রতিটি পেশার প্রতিটা ভোটারের মূল্য এবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি এবং কৃষক হল বাংলাদেশের প্রাণ। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ক্ষুধা মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কৃষির প্রতিটি সেক্টরে উন্নয়নের জন্য জোর দিতে হবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলগুলোকে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি হলো কৃষি। তাই জনগণের ভাগ্যের চাকা উন্নয়নের জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহার ঘোষণা করতে হবে। কৃষি শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হবে এবারের ইশতেহারে। আর সেজন্য কৃষি শিল্পের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে ইশতেহার দিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

কৃষি শিল্পের উন্নয়ন অক্ষুণ্ণ রাখতে এবারের ইশতেহারে পরিকল্পনার ভিত্তিতে আধুনিক কৃষিকে আরও টেকসই করার লক্ষ্যে এবং কৃষিতে ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস এর তিন শূন্য তত্ত্বের প্রয়োগ করার অঙ্গীকার করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোতে।

ক্রমবর্ধমান জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ, আধুনিক কৃষির বাণিজ্যিক প্রসার, কৃষি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাঁচামালের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করা এবং দারিদ্র্য নিরসন যেন হয় ইশতেহারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। নির্বাচিত হওয়ার এক বা দুই বছর পর নির্বাচনের ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকারনামা যেন ভুলে যেতে বসে দলগুলো। তাই কৃষি ও কৃষকের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবশ্যই মাথায় নিয়ে এবারের ইশতেহার ঘোষণা করতে হবে বলে একজন কৃষিবিদ হিসেবে আমি তা মনে করি।

১. কৃষি ঋণ সহজ করার লক্ষ্যে এবং কম সুদে কৃষি ঋণ দেওয়ার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিভিন্ন এনজিওকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। যাতে সহজে কৃষকরা কম সুদে ঋণ পেতে পারে।

২. কৃষিকে আধুনিকায়ন করার জন্য কৃষি সংশ্লিষ্ট সকল কাঁচামাল ও আধুনিক যন্ত্রপাতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর মওকুফ করতে হবে ।

৩. নিজেদের মধ্যে আবাদি জমি কেনা বেচার ক্ষেত্রে সহজ পদ্ধতিতে জমির দলিল ও কাগজপত্র উঠানো ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

৪. আধুনিক কৃষির উন্নয়নের জন্য কৃষিতে জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, রোবটিক্স, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর ব্যবহার সম্পর্কে কৃষকদেরকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৫. গবাদিপশু এবং দুগ্ধ শিল্পের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ বৃদ্ধির মেগা প্রকল্প হাতে নিতে হবে।

৬. প্রোল্টি শিল্পের উন্নয়নে গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্যের কাঁচামালে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। কম দামে বাচ্চা উৎপাদন এবং ডিম উৎপাদনের জন্য সব সময় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে হবে।

৭. জনগণের আমিষের অভাব পূরণের লক্ষ্যে টেকসই মৎস্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণ এর মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন দ্বিগুণ উন্নতি করতে হবে। সুনীল অর্থনীতির বিকাশ সাধন ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের সুস্থ ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং মৎস্য আহরণ নিশ্চিত করতে হবে। মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য উৎপাদন এবং দেশের বাহিরে আমদানিকরণের লক্ষে বেসরকারি খাতকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মৎস্যপন্য প্রক্রিয়াকরণে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন তৈরি করতে হবে।

৮. জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় হাওর চর উন্নয়নের জন্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।

৯. কৃষকদের আলু, টমেটো, পেঁয়াজ এবং বিভিন্ন রকম শাক সবজি সংরক্ষণের জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে হিমায়িত সংরক্ষণাগার স্থাপন করতে হবে।

১০. কৃষকদের জন্য সঠিক সময়ে সার নিশ্চিত করা, কার্ডের মাধ্যমে কৃষির উপকরণ বিতরণ এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে মনিটরিং বোর্ড গঠন করতে হবে।

যদিও ইশতেহারে সবকিছু ব্যাখ্যা করা কঠিন। তারপরও এবারের নির্বাচনটা যেহেতু অন্যান্য নির্বাচন থেকে একটু ব্যতিক্রম তাই কৃষি ও কৃষকের ভাগ্যের কথা চিন্তা করে কৃষির উন্নয়নের প্রধান পয়েন্টগুলো নোট আকারে সংযুক্ত করে ইশতেহার ঘোষণা করলে ভালো হবে। যাতে করে কৃষি ও কৃষকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একটি বাস্তব ধারণা পায় এবং পরবর্তী সময়ে যাতে সংসদ সদস্যকে সরাসরি প্রশ্ন করা যায় এমন একটি উদ্যোগ ইশতেহারের সংযুক্ত করতে হবে। সর্বোপরি আগামীর আধুনিক বাংলাদেশে কৃষি ও কৃষকের ভাগ্যের কথা চিন্তা করে রাজনৈতিক দলগুলোকে ইশতেহার সাজাতে হবে, যাতে করে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়।

মো. নাজমুল হাসান

শিক্ষার্থী, পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত