ঢাকা বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সাংবাদিকতা : পেশা নাকি ঝুঁকি

ফারিহা জামান নাবিলা
সাংবাদিকতা : পেশা নাকি ঝুঁকি

সাংবাদিকতা যেন এক হাতে কলম, অন্য হাতে আগুন। এই কলম সত্য লিখে, অন্যায় উন্মোচন করে, কিন্তু অনেক সময় সেই আগুনই সাংবাদিকের জীবনে ঝুঁকি হয়ে ফিরে আসে। সমাজের অন্ধকার দিকগুলো আলোর সামনে আনাই সাংবাদিকের কাজ। কিন্তু এই আলো দেখানোর পথে অনেককে ভয়, হুমকি এমনকি জীবন ঝুঁকির মুখেও পড়তে হয়। তাই প্রশ্ন ওঠে- সাংবাদিকতা কি শুধু একটি পেশা, নাকি প্রতিদিনের ঝুঁকির নাম?

গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতাকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা, ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সত্য প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নানা চাপ, হুমকি ও বাধার মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় সত্য বলার মূল্য দিতে হয় চাকরি, নিরাপত্তা কিংবা জীবন দিয়ে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর বহু সাংবাদিক হামলা, মামলা ও হত্যার শিকার হন। প্রতিবেদন করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক হুমকি পান, আবার কেউ কেউ গুম বা প্রাণ হারান। যুদ্ধক্ষেত্র, দুর্নীতিগ্রস্ত এলাকা বা অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে কাজ করা সাংবাদিকদের ঝুঁকি আরও বেশি। সাংবাদিকতা শুধু ডেস্কে বসে লেখার কাজ নয়, এটি একটি বিপজ্জনক দায়িত্বও। সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠার প্রধান কারণ হলো সত্য প্রকাশের সাহস। সাংবাদিকরা যখন দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার তুলে ধরেন তখন তা অনেক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত করে। ফলে তারা সাংবাদিকদের ভয় দেখায়, হুমকি দেয় বা মামলা দিয়ে হয়রানি করে। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ অনেক সময় সংবাদ প্রকাশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকে। নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরতে গেলে সাংবাদিকদের চাকরি হারানোর ভয় বা শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।আইনি সুরক্ষার দুর্বলতা সাংবাদিকতার ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর আইন নেই বা থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ হয় না। ফলে হামলা বা হুমকির ঘটনায় বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও সাহস পায়।এছাড়াও যুদ্ধ, সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় কাজ করা সাংবাদিকদের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তারা সরাসরি সহিংসতার মুখোমুখি হন।

সাংবাদিকতাকে নিরাপদ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই দরকার শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি বা হয়রানির ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এতে অপরাধীরা সাহস পাবে না। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক বা কর্পোরেট চাপমুক্ত হয়ে সাংবাদিকদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা হলে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়বে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজের আগে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, বিমা সুবিধা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর এ বিষয়ে দায়িত্ব নিতে হবে। সাংবাদিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা জোরদার করতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ও আইনি সহায়তা ঝুঁকি কমাতে পারে।

সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয় এটি সাহস, নৈতিকতা ও দায়িত্বের এক কঠিন পরীক্ষা। এই পেশায় ঝুঁকি রয়েছে কারণ সাংবাদিকরা সমাজের সত্য তুলে ধরেন এবং ক্ষমতার কাছে প্রশ্ন করেন। কিন্তু এই ঝুঁকিই সাংবাদিকতার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। যদি সাংবাদিকতা না থাকে তবে সত্য চাপা পড়ে যাবে, অন্যায় আরও শক্তিশালী হবে এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকতা একটি অপরিহার্য ও সম্মানজনক পেশা। রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা, যাতে তারা ভয়মুক্ত হয়ে সত্যের পথে কাজ করতে পারেন। সাংবাদিকতা তখনই প্রকৃত অর্থে সফল হবে, যখন এটি ঝুঁকির নাম নয়, বরং সত্য ও জনকল্যাণের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

ফারিহা জামান নাবিলা

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত