প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এমন এক বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নৈতিকতা ও আদর্শের প্রভাব ক্ষীণ হয়ে ক্ষমতা ও কৌশলই রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্তকে চালিত করছে। ভেনিজুয়েলার ওপর আধিপত্য বিস্তারের ভাষা, গ্রিনল্যান্ডের মতো ভূখণ্ডকে ‘কেনা যায়’- এমন ভাবনা, ইরানে সরাসরি হামলার হুমকি কিংবা মিত্র রাষ্ট্রকেও অস্বাভাবিক শুল্কের ভয় দেখানো- এসব ঘটনা মিলিয়ে দেখলে এক ধরনের আগ্রাসী বিশ্বনীতির পুনরাবির্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই বাস্তবতার কেন্দ্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল আলাদা করে নজর কাড়ে- যে কৌশল কারও দৃষ্টিতে বাস্তববাদ, কেউ বলেন রাজনৈতিক দম্ভ, কেউ বা সরাসরি অস্থিরতা।
ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ দেখায়, সার্বভৌমত্ব এখন আর অখণ্ড নীতি নয়; বরং প্রয়োজন হলে তা উপেক্ষা করাও বৈধ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ইরান প্রসঙ্গে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ সরকারবিরোধী আন্দোলন আন্তর্জাতিক শক্তির জন্য হস্তক্ষেপের নৈতিক অজুহাত হয়ে উঠছে। গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান আবার বিশ্বনীতিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ঔপনিবেশিক মানসিকতার দিকে- যেখানে ভূখণ্ডও একধরনের সম্পদ। এই পরিবর্তিত বিশ্বনীতির প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে- বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল ও কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কোথায় দাঁড়িয়ে?
আমাদের দেশ ঐতিহাসিকভাবে অ-জোটনীতি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা- এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে এসেছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে শুধু নীতিগত অবস্থান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা এবং ভারসাম্য রক্ষার কৌশল। কারণ আজকের বিশ্বে নিরপেক্ষ থাকা আর নিরাপদ থাকার অর্থ এক নয়।
বিশ্বনীতির এই পরিবর্তন সরাসরি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও প্রভাবিত করছে, বিশেষ করে নির্বাচন প্রসঙ্গে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো এখন আর কেবল পর্যবেক্ষক নয়; তারা নির্বাচন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নকে কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। ফলে বাংলাদেশের নির্বাচন আর কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়-এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও একটি উপাদান।
এখানেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজন দেখা দেয়। একদিকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নির্বাচন পরিচালনার অধিকার রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিও এড়াতে হবে। ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দেশটির সাম্প্রতিক নির্বাচনি প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, যার ফলে একাধিক রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচনি স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। এর ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশ তেল খাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও সৃষ্টি করেছে। এই অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয় যে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক উপেক্ষা করলে তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ ভেনিজুয়েলা নয়। আমাদের অর্থনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সনির্ভর। শান্তিরক্ষী বাহিনীর ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং ভৌগোলিক অবস্থান ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এই শক্তিগুলোই আমাদের কূটনৈতিক পুঁজি। ট্রাম্পের রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- বিশ্বনীতির কোনো কিছুই এখন পূর্বানুমানযোগ্য নয়। আজ যে মিত্র, কাল সে চাপের উৎস হতে পারে। আজ যে নীতি চলমান, কাল তা বদলে যেতে পারে একটি টুইটে। এই অনিশ্চয়তার যুগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত নীতি ও ঘোষনার পরিবর্তে প্রস্তুতি এবং কৌশল।।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্বরাজনীতির এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সুযোগও আছে, ঝুঁকিও আছে। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ভয় নয়, বরং পরিমিত প্রজ্ঞা ও কৌশলগত সচেতনতা থাকা জরুরি। বাংলাদেশ কি এই রূপান্তরকে নিছক অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখবে, নাকি সংলাপ ও ভারসাম্যের পথ ধরে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করবে- সেই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করবে। কেননা, ইতিহাস ইঙ্গিত দেয়, সময়ের পরিবর্তনকে যারা উপলব্ধি করতে পারে এবং নীরব দূরদর্শিতায় নিজেদের মানিয়ে নিতে জানে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় স্থায়িত্ব তাদেরই সঙ্গী হয়।
লেখা-মারিয়া হক শৈলী
শিক্ষার্থী (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ), ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা